বেসরকারি প্র্যাকটিসে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার দাবি, চিকিৎসকদের সম্মানে আঘাতের অভিযোগ ডক্টরস টিচার্স ফোরামের
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২৭ জুন : আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ (এজিএমসি) ও জিবি পন্ত হাসপাতালের চিকিৎসকদের বেসরকারি প্র্যাকটিসে নিষেধাজ্ঞা জারি করার রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে সুপারস্পেশালিটি ডক্টরস ও টিচার্স ফোরামের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করা হয়।ফোরামের সভাপতি ডাঃ তপন মজুমদার বলেন, স্বাস্থ্য সচিবের সাম্প্রতিক মন্তব্য চিকিৎসক সমাজের সম্মানে আঘাত করেছে।
সরকারের উচিত বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। ডাঃ মজুমদার বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এজিএমসি ও জিবি পন্ত হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলে শুধু চিকিৎসকরাই নন, সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হবে। বহু রোগী দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নিয়ে আসছেন। হঠাৎ সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, বাস্তব চিত্র হলো এখনও অনেক মানুষের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর পূর্ণ আস্থা তৈরি হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি, পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং হাসপাতালের পরিবেশও এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ করে দিলেই স্বাস্থ্য পরিষেবার মান উন্নত হবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ফোরামের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে অসন্তুষ্ট চিকিৎসকদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং চিকিৎসক সমাজকে অসম্মান করার সামিল। ডাঃ তপন মজুমদার বলেন, যে চিকিৎসকরা বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এজিএমসি ও জিবি পন্ত হাসপাতালকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন, তাঁদের এভাবে অপমান করা উচিত নয়।তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কর্মরত বহু সুপারস্পেশালিটি চিকিৎসক এমন সময় সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, যখন বেসরকারি প্র্যাকটিসের উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
সেই শর্তেই তাঁরা সরকারি পরিষেবায় যুক্ত হন। এখন কোনও আলোচনা ছাড়াই সেই শর্ত পরিবর্তন করা হলে তা ন্যায়সঙ্গত নয়। ডক্টরস টিচার্স ফোরামের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বহু অভিজ্ঞ সুপারস্পেশালিস্ট চিকিৎসক সরকারি চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে এজিএমসি মেডিক্যাল কলেজ ও জিবি পন্ত হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা, উচ্চশিক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট তৈরি হলে মেডিক্যাল কলেজ পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা মনে করছে। চিকিৎসকদের দাবি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলি অন্যত্র।চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, পদোন্নতি ও প্রণোদনার সমস্যা, এসব সমাধান না করে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিলে স্বাস্থ্য পরিষেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়।
ফোরামের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে “অপ্ট-ইন” পদ্ধতি চালুর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।অর্থাৎ, চিকিৎসকরা স্বেচ্ছায় সরকারি নির্ধারিত শর্তে সম্পূর্ণ সময় সরকারি পরিষেবায় যুক্ত থাকবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়ার সুযোগ পান।উল্লেখ্য, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স (এনপিএ) দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে রাজ্য সরকার। তবে চিকিৎসক সংগঠনের বক্তব্য, স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন সরকারের যেমন দায়িত্ব, তেমনই সেই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি চিকিৎসকরাও। তাই একতরফা সিদ্ধান্ত বা কঠোর অবস্থানের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধানে পৌঁছানো উচিত, যাতে চিকিৎসক, রোগী এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সব পক্ষই উপকৃত হয়।