৭৩ তমএনইসি প্লেনারি বৈঠক, ত্রিপুরার প্রত্যাশা, বিনিয়োগ, রেল সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা : উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন, আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে উত্তর-পূর্ব পরিষদের (NEC) ৭৩তম প্লেনারি বৈঠকে অংশ নিতে বুধবার রাজ্য ছেড়েছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ডা: মানিক সাহা।
এবারের বৈঠক ৪ জুন মেঘালয়ের শিলং-এ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং এতে সভাপতিত্ব করবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যিনি উত্তর-পূর্ব পরিষদের চেয়ারম্যানও। বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় ডোনার (DoNER) ও যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্যেয় এম সিন্দিয়া এবং ডোনার প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার-সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের শীর্ষ আধিকারিকরা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এনইসি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে আসছে।
এবারের বৈঠকে পর্যটন, কৃষি ও উদ্যানপালন, বিনিয়োগ প্রসার, অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক করিডর উন্নয়ন, কুটির শিল্প, দুগ্ধ ও মৎস্য ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রূপরেখা ‘নর্থ ইস্ট ভিশন ২০৪৭’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। ত্রিপুরার পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা বিশেষভাবে অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলি তুলে ধরবেন। রাজ্য সরকারের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ত্রিপুরা বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা অবস্থান, উন্নত জাতীয় সড়ক, রেলপথ সম্প্রসারণ এবং আগরতলা-আখাউড়া আন্তর্জাতিক রেল সংযোগ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজ্যকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিপুরার জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে রেল নেটওয়ার্কের আরও সম্প্রসারণ, শিল্প করিডর গঠন, লজিস্টিক হাব স্থাপন এবং সীমান্ত বাণিজ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন। আগরতলা-সাবরুম রেল সংযোগ চালুর পর দক্ষিণ ত্রিপুরার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভবিষ্যতে সাবরুমের কাছে মৈত্রী সেতু এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপিত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এনইসি বৈঠকে ত্রিপুরা শিল্পোদ্যোগ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বাঁশভিত্তিক শিল্প, রাবার শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কেন্দ্রীয় সহায়তা ও বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানানো হতে পারে।
ত্রিপুরা বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে পরিচিত। ফলে রাবার-ভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হবে।অসম, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও বাজার সংযোগ আরও সহজ হলে আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কেন্দ্রের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ জোরদার করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়নে ত্রিপুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
গত কয়েক বছরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, ডিজিটাল সংযোগ এবং শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্র সরকার একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। NESIDS, PM-DevINE এবং NEC-অর্থায়িত বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও এবারের বৈঠকে পর্যালোচনা হবে। রাজ্যের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক থেকে ত্রিপুরার জন্য নতুন শিল্প প্রকল্প, উন্নত রেল ও সড়ক যোগাযোগ, সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসবে।
একই সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য কেন্দ্র নির্ধারণ করেছে, সেই যাত্রায় ত্রিপুরা আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করার সুযোগ পাবে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। উল্লেখ্য, উত্তর-পূর্ব পরিষদ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের মধ্যে সমন্বিত উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে থাকে। এবারের ৭৩তম প্লেনারি বৈঠককে তাই শুধু একটি প্রশাসনিক বৈঠক নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।