প্ল্যানেট ত্রিপুরা— বিশেষ প্রতিবেদন :-
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম, মেঘ-কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি এলাকা। সেখানে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী এক আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাম্প্রতিক একটি অভিযোগ ঘিরে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে দেশের প্রতিরক্ষা মহলে। স্থানীয়দের দাবি—কোনো ঘোষণা নেই, কোনো যুদ্ধ নেই, অথচ চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) নাকি নীরবে তাদের ঐতিহ্যগত জমিতে ঢুকে পড়েছে। তৈরি করে ফেলেছে পাকা রাস্তা, সেতু এবং সামরিক শিবির।
অথচ, এই চাঞ্চল্যকর দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। সেনার স্পষ্ট বক্তব্য—অরুণাচল প্রদেশে নতুন করে কোনো চীনা অনুপ্রবেশ বা ক্যাম্প তৈরির খবর সঠিক নয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সত্যটা ঠিক কোথায়? কেন প্রতি বছর ভারত-চীন সীমান্ত নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক বারবার ফিরে আসে? এই রহস্যের জট খুলতে আমাদের ফিরে যেতে হবে এক শতাব্দীরও বেশি পেছনে।
বিরোধের বীজ বোনা হয়েছিল আজ থেকে ১১২ বছর আগে। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের প্রতিনিধিরা শিমলায় একটি বৈঠকে বসেন। সেখানেই নির্ধারিত হয় ‘ম্যাকমোহন লাইন’, যা বর্তমান অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই বৈঠকে চীনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, তারা এই চুক্তিতে কখনো স্বাক্ষর করেনি। ফলে শুরু থেকেই এই সীমান্তকে মানতে অস্বীকৃতি জানায় বেইজিং।
১৯৬০ সালের সেই প্রস্তাব: ১৯৬০ সালে চীন ভারতকে একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিল—পশ্চিমে আকসাই চিন থাকবে চীনের দখলে, আর পূর্বে ম্যাকমোহন লাইনের দক্ষিণের এলাকা (অরুণাচল) থাকবে ভারতের হাতে। কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভারত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
এর মাত্র দুই বছর পর, ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে পুরোদস্তুর যুদ্ধ বেঁধে যায়। যুদ্ধে চীন সামরিকভাবে এগিয়ে থাকলেও পরে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু সীমান্ত সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। আজও দুই দেশের মধ্যে যে সীমারেখা কার্যকর রয়েছে, তা-ই হলো লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (LAC)। এটি কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সীমান্ত নয়, বরং দুই দেশ নিজেদের দাবি অনুযায়ী এখানে টহল (Patrolling) দেয়। আর এই অস্পষ্টতার সুযোগেই তৈরি হয় সংঘাত।
গত এক দশকে এই সীমান্ত আরও বেশি উত্তপ্ত ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালে ডোকলাম মালভূমিতে ভারত ও চীনের সেনারা টানা ৭৩ দিন মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ না হলেও ট্যাংক, ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ঠিক এই সময় থেকেই চীন যুদ্ধের কৌশলে এক নতুন মাত্রা যোগ করে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘মানচিত্রের যুদ্ধ’ বা ‘কার্টোগ্রাফিক আগ্রাসন’। অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন পাহাড়, নদী ও গ্রামের নাম একতরফাভাবে চীনা ভাষায় পরিবর্তন করে সরকারি তালিকা প্রকাশ করতে শুরু করে বেইজিং।
এক নজরে চীনের নাম বদলের পরিসংখ্যান:
-
২০১৭: ৬টি স্থান
-
২০২১: ১৫টি স্থান
-
২০২৩: ১১টি স্থান
-
২০২৪: ৩০টি স্থান
-
২০২৫: ২৭টি স্থান
-
২০২৬: ২৩টি স্থান
বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশের প্রায় ৯০টি স্থানের নিজস্ব চীনা নাম ব্যবহার করছে বেইজিং। তাদের দাবি, এই অঞ্চল আসলে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ এবং তাদেরই ভূখণ্ডের অংশ।
চীনের এই নাম পরিবর্তনের রাজনীতিকে ভারত অবশ্য শুরু থেকেই কঠোরহস্তে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফ কথা—“কাগজে-কলমে নাম বদলে দিলেই মাটির মালিকানা বদলে যায় না। অরুণাচল প্রদেশ অতীতেও ভারতের ছিল, বর্তমানেও ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চীন এই কাজটি খামখেয়ালিবশত করছে না। এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দাবিকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করার একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল (Salami Slicing Tactics)। একদিকে সীমান্তে সামরিক পরিকাঠামো বৃদ্ধি, আর অন্যদিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি—এই দুই নীতিতেই এগোচ্ছে বেইজিং।
অরুণাচল সীমান্তে স্থানীয়দের দাবি এবং সেনাবাহিনীর বিবৃতির মধ্যে যে ফারাক, তা মূলত এলএসি (LAC)-র জটিল ভূপ্রকৃতি এবং দুই দেশের ভিন্ন সীমান্ত ধারণার ফল। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—হিমালয়ের এই দুর্গম সীমান্তে রাইফেল ও কামানের গর্জন না থাকলেও, মানচিত্র, পরিকাঠামো আর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের যে ‘শীতল যুদ্ধ’ চলছে, তা অদূর ভবিষ্যতে থামার কোনো লক্ষণ নেই।