সরকারি পরিসংখ্যানই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও জনপরিষেবার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে, প্রদেশ কংগ্রেস
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৪ জুলাই : রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দুর্নীতি, স্বাস্থ্য পরিষেবার সংকট, কৃষকদের দুর্দশা, খাদ্য দপ্তরে অনিয়ম, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক নীতির সমালোচনায় সরব হলো প্রদেশ কংগ্রেস। শনিবার প্রদেশ কংগ্রেস ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, মানুষের অভিযোগ নয়, বরং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নিজেদের প্রকাশিত সরকারি তথ্যই প্রমাণ করছে যে উন্নয়নের দাবি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপি নেতৃত্ব সর্বত্র উন্নয়নের দাবি করলেও সরকারি পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অথচ কেন্দ্র সরকার দেশের অর্থনীতিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, বাস্তবে সাধারণ মানুষের ওপর ঋণের বোঝা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সাফল্যের প্রচারের প্রসঙ্গ টেনে প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।পাশাপাশি সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকার এই ঘটনাগুলিকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র প্রচারেই ব্যস্ত।রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, এটি বিরোধী দলের অভিযোগ নয়, বরং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত তথ্যই উদ্বেগজনক বাস্তবতার পরিচয় দিচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে ৯৩৮টি খুন, নারী নির্যাতন-সহ মোট ৩৮ হাজার ৭৯০টি গুরুতর অপরাধ, ১,০৭১টি অপহরণ এবং ৮৭২টি দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। শুধু চলতি বছরের ১ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই ৭টি খুন, ৯টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা, ৫টি শ্লীলতাহানি, ২৮টি চুরি এবং ৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে গার্হস্থ্য হিংসার বলি হয়েছেন ৯ জন মহিলা, যার মধ্যে ৪ জন খুন এবং ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়াও অভাব-অনটনের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রবীর চক্রবর্তীর দাবি, রাজ্যে আইনের শাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে।সরকারি আধিকারিকদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি, হুমকি এবং বেআইনি কাজে বাধ্য করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অতীতে তেলিয়ামুড়া, গণ্ডাছড়া, ডম্বুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন বহু ঘটনা ঘটেছে।
তাঁর অভিযোগ, শাসকদলের প্রভাবশালী নেতা, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনের একাংশও আইন ভঙ্গের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে, ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। দুর্নীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন আইএএস আধিকারিককে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, ভুয়ো পরিচয়ে সরকারি দপ্তর ব্যবহার, টেন্ডার সংক্রান্ত অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। অতীতে উৎপল চৌধুরীর ঘটনাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এমন ঘটনার পরেও প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেন, জিবি হাসপাতালে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের সিদ্ধান্তকে সরকার জনস্বার্থে নেওয়া পদক্ষেপ বলে প্রচার করলেও বাস্তবে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি জানতে চান, চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে কি না, বহির্বিভাগে রোগী দেখার ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে কি না কিংবা হাসপাতালে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও পরিকাঠামো বৃদ্ধি করা হয়েছে কি না। তাঁর মতে, শুধুমাত্র প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করলেই সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মান উন্নত হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, জিবি হাসপাতালে নিয়মিত অব্যবস্থাপনা, রোগীদের দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা না পাওয়া, ট্রলি ও হুইলচেয়ারের সংকট, অস্ত্রোপচার চলাকালীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এবং কেনাকাটায় অনিয়মের মতো সমস্যাগুলির কোনও স্থায়ী সমাধান সরকার করতে পারেনি। বরং এসব বিষয়ে তদন্তের দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
কৃষি ক্ষেত্র নিয়েও সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন প্রবীর চক্রবর্তী। তিনি বলেন, কৃষিমন্ত্রী উন্নয়নের দাবি করলেও বাস্তবে বহু কৃষক চাষ ছেড়ে অন্য রাজ্যে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সেচের অভাবে বহু একর জমি পতিত পড়ে রয়েছে। কাতলামারা, ব্রহ্মকুণ্ড, কমলপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে সরকারি ভর্তুকিতে বিতরণ করা মিনি পাওয়ার টিলার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অধিকাংশ যন্ত্র অকৃষকদের হাতে পৌঁছেছে এবং অনেক যন্ত্র অল্পদিনেই অকেজো হয়ে পড়েছে। খাদ্য দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, রেশন ব্যবস্থাকে জনমুখী করার নামে যে প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল, তার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি।
একবার কিছু সামগ্রী বিতরণের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। টেন্ডার প্রক্রিয়া, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং খাদ্যশস্য পরিবহণেও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।মাদক পাচার প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, রাজ্যে একের পর এক কোটি টাকার মাদক উদ্ধার হলেও প্রকৃত পাচারচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার কথা বললেও সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনও সামনে আসেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ভারতের মহাহিসাব নিরীক্ষক (সিএজি)-এর একের পর এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আর্থিক অনিয়মের উল্লেখ থাকলেও সরকার তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য জবাব দিতে পারেনি। তাই রাজ্যের আর্থিক লেনদেন, সরকারি প্রকল্প এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানায় প্রদেশ কংগ্রেস। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত রাজ্য যুব কংগ্রেস সভাপতি নীলকমল সাহাও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নিট, নেট, টেট-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করেন এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের হাত থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানান। সবশেষে প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই সমস্ত বিষয় নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস চুপ করে থাকবে না।আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবিতে আগামী দিনেও রাজ্যজুড়ে ধারাবাহিক গণআন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে অবিলম্বে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং প্রকৃত পরিস্থিতি রাজ্যবাসীর সামনে তুলে ধরার দাবি জানান।