Home » Blog » মুঙ্গিয়াকামীতে প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

মুঙ্গিয়াকামীতে প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

স্বাধীনতার আট দশকেও মেলেনি পানীয় জল

by Planet Tripura
0 comments 3 views

নিজস্ব প্রতিনিধি, তেলিয়ামুড়া: একবিংশ শতাব্দীর ভারত। দেশজুড়ে ডিজিটাল উন্নয়নের জয় গান, স্মার্ট গ্রামের স্বপ্ন, আর উন্নয়নের নানান চটকদার পরিসংখ্যান। কিন্তু এই ছবির আড়ালেই ঢেকে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। খোয়াই জেলার তেলিয়ামুড়া মহকুমার মুঙ্গিয়াকামী ব্লকের প্রত্যন্ত নোনাছড়া এডিসি ভিলেজের প্রজা বাহাদুর মলসম পাড়া যেন আজ সময়ের কাছে পরিত্যক্ত এক জনপদে পরিণত হয়েছে । স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পার হতে চললেও, এখানকার বহু পরিবারের কাছে এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানীয় জল আজও চরম বিলাসিতা! জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাঁদের একমাত্র ভরসা এখন পাহাড়ি ছড়ার ঘোলা ও অপরিশোধিত জল। ভোরের আলো ফুটতেই এই গ্রামের চেনা ছবিটা বুক কাঁপিয়ে তোলে। আবালবৃদ্ধবনিতা, এমনকি কচি শিশুরাও হাতে কলসি, বালতি কিংবা প্লাস্টিকের পাত্র নিয়ে ছুটে যান পাহাড়ের ঢালে। কেউ নেমে পড়েন পাথুরে ছড়ায়, কেউ আবার জীবন ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে যান পাহাড়ের গা বেয়ে বেরিয়ে আসা সরু জলধারার কাছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর যতটুকু জল মেলে, সেটুকুই সারাদিনের পানীয়, রান্না ও সংসারের একমাত্র ভরসা। এই তাদের জীবন।

বর্ষা নামলেই এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পাহাড়ি মাটি, পচা পাতা আর বৃষ্টির স্রোতে ভেসে আসা নানা ময়লায় ছড়ার জল সম্পূর্ণ দূষিত হয়ে পড়ে। কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। তৃষ্ণা মেটাতে, সন্তানকে এক গ্লাস জল খাওয়াতে কিংবা ভাতের হাঁড়ি চড়াতে সেই ক্ষতিকারক জলই ব্যবহার করতে বাধ্য হন গ্রামের অসহায় মানুষগুলো। এমনকি দরিদ্রতার কারণে সেই জল ফুটিয়ে খাওয়ার মতো জ্বালানির সুযোগও নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এই দূষিত জল ব্যবহার করার ফলে গ্রামে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটের সংক্রমণ-সহ বিভিন্ন মারাত্মক জলবাহিত রোগ লেগেই রয়েছে। প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও প্রবীণরা। অথচ চিকিৎসার জন্য যেতে হয় বহু দূরে। অর্থের অভাব, দুর্গম পাহাড়ি পথ আর স্বাস্থ্য পরিষেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই নীরবে বাড়িতেই তীব্র কষ্ট সহ্য করে থাকেন ।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই সংকট আজকের নয়। গ্রামবাসীদের দাবি, বহুবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আবেদন, স্মারকলিপি, জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার দরবার—সবই হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আজও গ্রামে পৌঁছায়নি নিরাপদ পানীয় জলের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। ফলে উন্নয়নের আলো দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছালেও, জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—বিশুদ্ধ পানীয় জল—নোনাছড়াবাসীর কাছে আজও অধরাই রয়ে গেছে।

গ্রামবাসীদের কণ্ঠে আজ একটাই আর্তি— “আমরা বিলাসিতা চাই না, চাই না কোনো বড় বড় প্রতিশ্রুতি। শুধু এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা চাই, যাতে আমাদের সন্তানদের আর দূষিত জল খেয়ে অসুস্থ হতে না হয়। এক ফোঁটা নিরাপদ জলই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন।” নোনাছড়ার এই বাস্তব ছবি শুধু একটি গ্রামের সংকট নয়, এটি প্রশাসনের উন্নয়নের দাবির সামনে এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরও যদি দেশের কোনো প্রান্তে মানুষকে দূষিত ছড়ার জল পান করে বেঁচে থাকতে হয়, তবে উন্নয়নের প্রকৃত সুফল আদৌ কি শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? এখন দেখার, প্রশাসন এই দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। নাকি পাহাড়ের এই মানুষগুলোর ভাগ্যে আরও দীর্ঘদিন জুটবে শুধু ফাঁকা প্রতিশ্রুতি আর রোগবাহী ছড়ার জল।

You may also like

Leave a Comment