বন্দেমাতরম গেয়ে শুরু হবে স্কুলের ক্লাস, তারপর জাতীয় সঙ্গীত, ত্রিপুরায় নতুন নির্দেশ, জাতীয় চেতনা জোরদারে বিশেষ উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৭ জুলাই : আগামী দিনে ত্রিপুরার সমস্ত সরকারি, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত, বেসরকারি বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসাগুলিতে প্রতিদিনের পাঠদান শুরু হবে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। প্রথমে সমবেতভাবে গাওয়া হবে ভারতের সাংবিধানিক স্বীকৃত জাতীয় গান বন্দেমাতরম-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ, এরপর পরিবেশিত হবে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’। এই নিয়ম মেনে তারপরই শুরু হবে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। রাজ্য মন্ত্রিসভার ২৫ জুনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শিক্ষা দপ্তর এই নির্দেশ জারি করেছে।
শিক্ষা দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব রাজীব দত্ত স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারির নির্দেশিকার আলোকে রাজ্যের সমস্ত বিদ্যালয়ে অভিন্নভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। শিক্ষা দপ্তরের মতে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জাতীয় সংহতি, দেশপ্রেম, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় প্রতীকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা। প্রতিদিনের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।বন্দেমাতরম গানটির রচয়িতা বিশিষ্ট সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
তিনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ-এ এই গানটি সংযোজন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রচিত এই গান পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়। অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামী “বন্দেমাতরম” ধ্বনি উচ্চারণ করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে ভারতের গণপরিষদ “জন গণ মন”-কে জাতীয় সঙ্গীত এবং “বন্দেমাতরম”-এর প্রথম দুই স্তবককে জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে দুটি গানের সাংবিধানিক মর্যাদা পৃথক হলেও উভয়ই দেশের জাতীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুটি গানই ভারতের মর্যাদার প্রতীক হলেও তাদের সাংবিধানিক অবস্থান আলাদা। জন গণ মন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত (National Anthem)।সরকারি অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস, বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এটি নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিবেশিত হয়।অন্যদিকে বন্দেমাতরম ভারতের জাতীয় গান (National Song)। এটি মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার চেতনাকে তুলে ধরে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই গানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্র সরকারের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং জাতীয় প্রতীকের প্রতি সম্মান আরও সুদৃঢ় করাই এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য। বিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সমবেত চেতনা এবং জাতীয় পরিচয়ের অনুভূতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরা সরকার সেই নির্দেশিকাকেই অনুসরণ করে রাজ্যের সমস্ত বিদ্যালয়ে অভিন্ন নিয়ম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অতীতেও বিদ্যালয়ে বন্দেমাতরম গাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং উত্তরপ্রদেশ-এ বিভিন্ন সময়ে সরকারি অনুষ্ঠান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্দেমাতরম গাওয়ার বিষয়ে নির্দেশ বা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রতিটি রাজ্যের বাস্তবায়ন পদ্ধতি এক নয়। কোথাও নির্দিষ্ট দিবসে, কোথাও নিয়মিত প্রার্থনা সভায়, আবার কোথাও প্রশাসনিক নির্দেশের ভিত্তিতে এটি পালন করা হয়। ত্রিপুরা এবার প্রতিদিনের বিদ্যালয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এই নিয়ম কার্যকর করার পথে এগোচ্ছে। শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে সমবেতভাবে পূর্ণাঙ্গ বন্দেমাতরম গাওয়া হবে।তার পরেই সমবেতভাবে “জন গণ মন” পরিবেশিত হবে। শিক্ষক, শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী এবং বিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মীদের এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে। জাতীয় গান বা জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন সকলকে সতর্ক অবস্থায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, চলাফেরা বা অন্য কোনো কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী জাতীয় গান অথবা জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় সকলকে, সোজা হয়ে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়াতে হবে।
মুখ গানের উৎস বা সমবেত মঞ্চের দিকে রাখতে হবে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। গান চলাকালীন অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বা কথাবার্তা বলা যাবে না। গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্মানজনক ভঙ্গি বজায় রাখতে হবে। শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের সঠিক উচ্চারণ, সুর এবং অর্থসহ “বন্দেমাতরম” ও “জন গণ মন” শেখানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, বিদ্যালয়ে প্রতিদিন জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্যের চেতনা আরও সুদৃঢ় হতে পারে।রাজ্য সরকারের আশা, এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় পরিচয়ের বোধকে আরও শক্তিশালী করবে।
