এসআইআর থেকে বিদ্যুতের বিল, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান, একাধিক ইস্যুতে সরব প্রদেশ কংগ্রেস, রাজ্যজুড়ে দেড় মাসব্যাপী আন্দোলনের ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা:
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস, স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশা, কর্মসংস্থানের সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের বাড়তি বিল এবং ওবিসি-এসসি কর্পোরেশনে দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে রেখে রাজ্যজুড়ে ধারাবাহিক গণআন্দোলনের ডাক দিল ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। শুক্রবার আগরতলার প্রদেশ কংগ্রেস ভবনে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশিস কুমার সাহা এবং প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী পৃথকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশিস কুমার সাহা বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে ত্রিপুরাসহ দেশের একাধিক রাজ্যে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) শুরু হতে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু ইতিমধ্যেই বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে, শাসকদলীয় জনপ্রতিনিধিরা বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) ডেকে নির্দেশ দিচ্ছেন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি স্যন্দন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদেও এই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। সেই খবরের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হলে গোটা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বহু বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই প্রদেশ কংগ্রেস মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিতভাবে দাবি জানিয়েছে, যাতে কোনও বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার খর্ব না হয় এবং গোটা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের উপর মানুষের আস্থা অটুট রাখতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে।
এরপর শিক্ষা ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে আশিস সাহা বলেন, নিট-সহ বিভিন্ন জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় দুর্নীতি এবং মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে কংগ্রেস আন্দোলন শুরু করেছে। ত্রিপুরাতেও সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ২ জুলাই থেকে দেড় মাসব্যাপী গণআন্দোলন শুরু হবে। জেলার পাশাপাশি ব্লক ও মণ্ডল স্তর পর্যন্ত এই কর্মসূচি পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান, এই তিনটি মৌলিক অধিকারকে সামনে রেখেই “পড়াই, কামাই ও দাবাই” শীর্ষক গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনায় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।অথচ কেন্দ্র সরকার বা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এখনও পর্যন্ত নৈতিক দায় স্বীকার করেননি।
তাই তাঁর পদত্যাগের দাবিতে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ ও ধর্না কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আশিস সাহা বলেন, শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পানীয় জল, বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রতিটি ক্ষেত্রেই বর্তমান রাজ্য সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষ নিত্যদিন নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অথচ সরকার জনস্বার্থের প্রশ্নে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না।বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত এক মাসে অসংখ্য সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও বিভিন্ন অতিরিক্ত চার্জ ও মাসুলের কারণে বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কেউ ১,৪০০ টাকার পরিবর্তে দ্বিগুণ বিল পাচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় না থাকলেও স্থায়ী চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে আগামী দিনে রাজ্যজুড়ে গণধর্না ও আন্দোলন সংগঠিত করা হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওবিসি ও এসসি কর্পোরেশনে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বারবার আবেদন জানানো হলেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই আগামী ২৯ জুন ওবিসি এবং এসসি কর্পোরেশন ঘেরাও কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে, প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, সম্প্রতি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, স্যন্দন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে যেভাবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠে এসেছে, তাতে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েই মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে।
সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতের ভুল নিয়ে কংগ্রেস আত্মসমালোচনা করেছে, কিন্তু বর্তমান সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ কতটা সুরক্ষিত রয়েছে, সেটাই আজ বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, এ কথা কংগ্রেস বহু আগেই স্বীকার করেছে। কিন্তু বর্তমানে দেশে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিরোধী কণ্ঠস্বর, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। প্রবীর চক্রবর্তী আরও বলেন, সম্প্রতি একটি মামলায় হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের দাখিল করা হলফনামা সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যুৎ দপ্তরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের উপর অযৌক্তিক চার্জ চাপানোর অভিযোগ তোলেন।
তাঁর দাবি, রেগুলেটরি কমিশনের সিদ্ধান্তের আড়ালে সরকার নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সংকট এবং জনজীবনের নানাবিধ সমস্যার বিরুদ্ধে আগামী দেড় মাস ধরে রাজ্যের প্রতিটি জেলা, ব্লক ও মণ্ডল স্তরে ধারাবাহিক গণআন্দোলন সংগঠিত করবে প্রদেশ কংগ্রেস। এই আন্দোলনে ছাত্র-যুব, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত সেন চৌধুরী, রাজ্য এসসি বিভাগের চেয়ারম্যান নিরঞ্জন দাস, ওবিসি বিভাগের চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন দেবনাথ, প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী এবং রাজ্য যুব কংগ্রেস সভাপতি নীলকমল সাহা।