
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৩০ এপ্রিল : পণের দাবিতে এক গৃহবধূর উপর দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের, এমন ঘটনা আর নতুন নয়, কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সমাজের এক গভীর অসুস্থ বাস্তবতাকে নগ্নভাবে সামনে নিয়ে আসে। আমতলী ও বোধজংনগর থানার অন্তর্গত দুই পরিবারের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়।
খবরে জানা যায়, আমতলী থানার অন্তর্গত নেতাজী সুভাষ কলোনি এলাকার বাসিন্দা রূপচান বেগমের সঙ্গে সামাজিকভাবে বিয়ে হয় বোধজংনগর থানার অন্তর্গত রতন নগর এলাকার কুদ্দুস মিয়ার ছেলে কবির হোসেনের। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই রূপচান বেগমের উপর পণের টাকা আনার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ। কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে না পারায় তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। বিয়ের দুবছর পর এক কন্যা সন্তানের জন্মের পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে বলে অভিযোগ।একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে রূপচান বেগম সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন।অভিযোগ, এরপর স্বামী তার কোনো খোঁজখবর নেননি।
বাধ্য হয়ে তিনি থানায় লিখিত মামলা দায়ের করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, শিক্ষিত সমাজে বসবাস করলেও পণের মতো কুসংস্কার এখনও গভীরভাবে প্রোথিত। উল্লেখ্য, পণ নেওয়া বা দেওয়া, দুই-ই আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও সমাজের একাংশে এই অপরাধ নির্দ্বিধায় চলছে, যা নারীর উপর নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক অভিযোগ, এর আগেও থানায় লিখিত আবেদন জানানো হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক ব্যর্থতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ যদি ভুক্তভোগীর অভিযোগই গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? এই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
শিক্ষিত সমাজের বড় অংশও এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেনি। অর্থ, লোভ এবং সামাজিক প্রতিপত্তির মোহে অনেকেই আজও পণের দাবিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার চেষ্টা করে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোধজংনগর থানার কাছে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, তারা কি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে প্রমাণ করতে পারবে যে আইন সবার জন্য সমান? শুধু মামলা রুজু করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, প্রয়োজন সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ।
অভিযুক্ত কবির হোসেন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এই ধরনের অপরাধে নমনীয়তা দেখানো মানে অপরাধকে উৎসাহ দেওয়া। একটি উদাহরণ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ পণের জন্য নির্যাতনের সাহস না পায়। তবে শুধুমাত্র আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এই লড়াই মূলত সামাজিক। পরিবার, প্রতিবেশী, স্থানীয় নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। পণের দাবিকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। যে পরিবার পণ দাবি করে, তাদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
নীরব দর্শকের ভূমিকা আর চলবে না। রাজ্যের মহিলা কমিশন, মানবাধিকার সংগঠন এবং নারী অধিকার রক্ষাকারী বিভিন্ন সংগঠনেরও এখনই সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত। ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা, মানসিক সমর্থন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের উপর নজরদারি করা প্রয়োজন। এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বৃহত্তর সামাজিক ব্যাধির প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি এখনও সচেতন না হই, তবে আগামী দিনে আরও অনেক রূপচান বেগম এই নির্যাতনের শিকার হবেন।
তাই সময় এসেছে কঠোর অবস্থান নেওয়ার, আইনের প্রয়োগে আপস নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। পণের মতো ঘৃণ্য প্রথাকে নির্মূল করতে এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। এখনই সময় চুপ থাকার নয়, প্রতিবাদ করার বলে অভিমত সচেতন নাগরিক সমাজের ।
