নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ১০ আগস্ট : কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপি সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের উপর করের বোঝা বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির অতিরিক্ত দাম এবং বিদ্যুৎ পরিষেবাকে ক্রমশ ব্যয়বহুল করে তোলার নীতির বিরুদ্ধে সরব হল ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। সোমবার এক প্রেস বিবৃতিতে দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে চলেছে এবং জনজীবনে তৈরি হয়েছে গভীর সংকট। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ারও অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেস মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তীর বক্তব্য, GST চালুর পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে করের বোঝা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক গ্যাস-সহ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর পড়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে কর্পোরেট স্বার্থের অনুকূলে বেসরকারিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের উদাহরণ হিসেবে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে প্রদেশ কংগ্রেস। দলটির অভিযোগ, সরকারের পরিকল্পনা ও কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যবস্থায় সরকারের অংশ মাত্র ৩ শতাংশ, আর ৯৭ শতাংশ অংশীদারিত্ব মোদী-ঘনিষ্ঠ কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কংগ্রেস মুখপাত্রের দাবি, এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ত্রিপুরায় স্মার্ট মিটার ও প্রিপেইড বিলিং ব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি সরব হয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। দলের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেস বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, কোথাও ১ হাজার টাকা রিচার্জ করার পর মাত্র পাঁচ বা সাত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরই ফের রিচার্জের প্রয়োজন হচ্ছে। আবার কোথাও ১ হাজার ২০০ টাকা রিচার্জ করার পর মাত্র দুই ইউনিট ব্যবহারের পরই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই ধরনের অস্বাভাবিকতার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ এখনও দিতে পারেনি বলেও দাবি কংগ্রেসের। দলের আরও অভিযোগ, গত সাড়ে আট বছরে বিদ্যুতের মাসুল এবং বিভিন্ন নামে চার্জ বাড়ানো হলেও তার কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। নিম্নমানের পরিষেবা, অস্বাভাবিক বিল এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট কোনও চিত্র নেই বলে দাবি করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। দলের বক্তব্য, দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অঘোষিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পানীয় জল সরবরাহ, হাসপাতাল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ হিসেবে ট্রান্সফরমারের ঘাটতি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাইনে ত্রুটি কিংবা ভূগর্ভস্থ কেবলের সমস্যার কথা বলা হলেও প্রকৃত সমস্যা দুর্নীতি, অব্যবস্থা, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব, প্রকৌশলীর ঘাটতি এবং পরিকল্পনাহীনতার মধ্যে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রদেশ কংগ্রেস।
কংগ্রেসের দাবি বিদ্যুৎ নিগমের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও বিস্ফোরক দাবি করেছে প্রদেশ কংগ্রেস মুখপাত্র । তার বক্তব্য, একসময় ত্রিপুরা উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে অন্য রাজ্যেও বিদ্যুৎ বিক্রি করতে সক্ষম ছিল এবং বিদ্যুৎ নিগমের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত ছিল। সেই নিগম বর্তমানে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝায় জর্জরিত বলে দাবি করা হয়েছে।ঠিকাদারদেরও শত শত কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে অভিযোগ কংগ্রেসের। কংগ্রেসের আরও অভিযোগ, গত সাড়ে আট বছরে এক ইউনিট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাও যুক্ত হয়নি। জনরোষের আশঙ্কায় সাময়িকভাবে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর চেষ্টা করা হলে তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। প্রদেশ কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান দাবি, অবিলম্বে স্মার্ট মিটার বাতিল করে ইতিমধ্যে বসানো মিটারগুলি তুলে নিতে হবে। একইসঙ্গে প্রিপেইড বিলিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছে দলটি। বিদ্যুৎ নিগমের বিলিং ও কালেকশন-সহ বিভিন্ন নন-টেকনিক্যাল কাজে যুক্ত কর্মীদের কর্মসংস্থান কোনওভাবেই কেড়ে নেওয়া যাবে না বলেও দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ, যোগ্য প্রকৌশলী-সহ সমস্ত শূন্যপদ পূরণ এবং ২০১৮ সালের পর থেকে আরোপিত অযৌক্তিক চার্জ বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। গত সাড়ে আট বছরে বাড়ানো বিদ্যুৎ মাসুল প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস। তা সম্ভব না হলে গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিকে ভর্তুকির মাধ্যমে অতিরিক্ত বোঝা থেকে রক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় রাজ্যবাসীকে সঙ্গে নিয়ে গণপ্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, E20 পেট্রোল নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস। দলের বক্তব্য, ইথানল মেশানো না হলে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে পেট্রোলের দাম আরও ৪০ টাকা বাড়ত কেন্দ্রের এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। একইসঙ্গে E20 ব্যবহারের ফলে মাইলেজ কমার যে প্রভাব পড়ছে, তার বোঝাও কার্যত গাড়ি ও বাইক ব্যবহারকারীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৪ ডলার কমার সময়ও দেশে পেট্রোলের দাম এক পয়সা কমানো হয়নি, এই প্রশ্নের জবাব কেন্দ্রকে দিতে হবে বলে দাবি করেছে দলটি। প্রদেশ কংগ্রেসের দাবি, গত তিন বছরে E20 ব্যবহারের ফলে কম মাইলেজের কারণে পেট্রোল ব্যবহারকারীদের আনুমানিক ৮৮,২৩৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হয়েছে। দলের প্রেস বিবৃতিতে সরকারি তথ্যের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ইথানল পেট্রোলের তুলনায় কম শক্তি উৎপন্ন করে এবং E20 ব্যবহারে গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ মাইলেজ কমার বিষয়টিও কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তথ্যে উঠে এসেছে। কংগ্রেস মুখপাত্ত্রের আরও দাবি, শুধুমাত্র গত অর্থবর্ষেই এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রায় ৩৭,৮৪৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। তবে এই সমস্ত পরিসংখ্যান ও অভিযোগ প্রদেশ কংগ্রেসের প্রেস বিবৃতিতে উত্থাপিত হয়েছে।
আমেরিকায় ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহারের উদাহরণ দিয়ে ভারতের বাস্তবতাকে আড়াল করা যায় না বলেও মন্তব্য করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। দলের বক্তব্য, সেখানে ইথানল ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি এবং E20-উপযোগী যানবাহনের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই তুলনায় সাধারণ মানুষের পকেটের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্মার্ট মিটার-প্রিপেইড নীতি এবং E20-এর মতো জনস্বার্থবিরোধী ব্যবস্থা চালু রাখা যাবে না। প্রদেশ কংগ্রেস অবিলম্বে স্মার্ট মিটার ও প্রিপেইড বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের পাশাপাশি E20 নীতিও প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। দাবি পূরণ না হলে রাজ্যবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর গণপ্রতিরোধ আন্দোলনের পথে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।