Home » Blog » মনশ্রীর পাশে হোসেন মানসুরি

মনশ্রীর পাশে হোসেন মানসুরি

মনশ্রীর চিকিৎসায় গণজাগরণ, পাশে দাঁড়াতে মহারাষ্ট্র থেকে আগরতলায় সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার হোসেন মানসুরি

by Planet Tripura
0 comments 2 views
মনশ্রীর চিকিৎসায় গণজাগরণ, পাশে দাঁড়াতে মহারাষ্ট্র থেকে আগরতলায় সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার হোসেন মানসুরি

মনশ্রীর চিকিৎসায় গণজাগরণ, মানবিকতার নজির গড়ছে ত্রিপুরা, মনশ্রীর পাশে দাঁড়াতে মহারাষ্ট্র থেকে আগরতলায় প্রখ্যাত সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার হোসেন মানসুরি

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ১১ জুলাই : মাত্র ২২ মাসের নিষ্পাপ শিশু মনশ্রী চৌধুরীর জীবন বাঁচানোর লড়াই আজ আর শুধুমাত্র একটি পরিবারের সংগ্রাম নয়, তা পরিণত হয়েছে গোটা ত্রিপুরার মানুষের মানবিকতার এক বিরল গণ-আন্দোলনে। জন্মগত বিরল ও জটিল রোগ স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফি (SMA)-তে আক্রান্ত মনশ্রীর চিকিৎসার জন্য রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ যেভাবে একসঙ্গে এগিয়ে এসেছেন, তা সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন। শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, কর্মচারী, কেরানি, ব্যবসায়ী, অটোচালক, রিকশাচালক, বিভিন্ন ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, এনজিও, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার, শিল্পী, সমাজকর্মী, প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ছোট ছোট অনুদান মিলেই গড়ে উঠছে এক বিশাল মানবিক তহবিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচার। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে তহবিল সংগ্রহ অভিযান। অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি কিংবা সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মনশ্রীর চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছেন। ফলে মনশ্রীর চিকিৎসা কার্যত এক গণ-আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে শনিবার এক আবেগঘন ঘটনার সাক্ষী থাকল আগরতলা।সুদূর মহারাষ্ট্র থেকে বিমানে করে মনশ্রীর পাশে দাঁড়াতে রাজ্যে এসে পৌঁছেছেন ভারতের প্রখ্যাত সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার হোসেন মানসুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ লক্ষ অনুসরণকারী থাকা মানসুরি দীর্ঘদিন ধরেই অসহায়, দুস্থ ও জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য জনসচেতনতা গড়ে তোলা, তহবিল সংগ্রহ এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের কাজে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ইতিমধ্যেই মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কোনো শিশুর জীবন বাঁচানোর আবেদন সামনে এলেই নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কাছে সাহায্যের আহ্বান জানান তিনি।

সেই কারণেই তাঁর নাম আজ সামাজিক মাধ্যমে মানবিক উদ্যোগের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। শনিবার সকাল প্রায় সাড়ে ১০টায় মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দরে পৌঁছাতেই রাজ্যের সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট, ব্লগার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বহু শুভানুধ্যায়ী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। ফুলের তোড়া ও শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। বিমানবন্দরেই বহু তরুণ-তরুণী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ভিড় জমান।অনেকেই বলেন, একজন জাতীয় স্তরের পরিচিত সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার শুধুমাত্র মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে ত্রিপুরায় এসে মনশ্রীর পাশে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে রাজ্যের মানুষের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি মনশ্রী চৌধুরীর বাড়িতে যান।সেখানে মনশ্রী, তার বাবা ধ্রুব চৌধুরী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। শিশুটির শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার বিভিন্ন দিক সম্পর্কেও বিস্তারিত জানেন। পরিবারের এই কঠিন লড়াইয়ে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে দৃঢ় থাকার পরামর্শ দেন তিনি এবং সর্বতোভাবে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। মনশ্রীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ সংগ্রহে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে হোসেন মানসুরি বলেন, একটি শিশুর জীবন বাঁচানো কোনো একটি পরিবারের একার দায়িত্ব হতে পারে না।

সমাজের প্রতিটি মানুষের সামান্য সহযোগিতাও একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ, তাঁর অসংখ্য অনুসরণকারী এবং সমাজের বিত্তবান অংশের কাছে মনশ্রীর চিকিৎসার জন্য উদারভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আবেদন জানান। একইসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ত্রিপুরার মানুষ যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসেছেন, তাতে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তাঁর এই সফর ঘিরে রাজ্যের সোশ্যাল মিডিয়া জগতেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। বহু কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ব্লগার ও সমাজকর্মী জানান, মনশ্রীর চিকিৎসার বিষয়টি তাঁরা আরও বৃহত্তর পরিসরে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরবেন, যাতে দ্রুত পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা যায়। তাঁদের মতে, এই লড়াই শুধু মনশ্রীর নয়, মানবিকতারও পরীক্ষা। মনশ্রীর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় শেষে শনিবার বিকেলেই মহারাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে ত্রিপুরা ত্যাগ করেন হোসেন মানসুরি। সফরের সময় অল্প হলেও তাঁর উপস্থিতি মনশ্রীর পরিবারকে নতুন সাহস জুগিয়েছে বলেই মনে করছেন উপস্থিত সকলেই। পাশাপাশি তাঁর এই উদ্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন মহলেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে, মানবিকতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, একজন শিশুর জীবন বাঁচানোর আহ্বানে গোটা দেশ একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

এদিকে এই মানবিক উদ্যোগে সামিল হয়েছে বামপন্থী যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইও।সংগঠনটি তাদের রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে শনিবার মনশ্রীর বাবা ধ্রুব চৌধুরীর হাতে একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অনুদানের চেক তুলে দেয়। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ডিওয়াইএফআই রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গৌতম ঘোষ, ডুকলি বিভাগীয় কমিটির সম্পাদক শুভঙ্কর মজুমদার, রাজ্য কমিটির সদস্য বিজয় বিশ্বাস এবং হাপানিয়া লোকাল কমিটির সম্পাদক আশিস চক্রবর্তী। চেক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ডিওয়াইএফআই নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের প্রতি আরও বেশি করে এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই বিরল রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি। তাই একদিনের সহানুভূতি নয়, লাগাতার আর্থিক সহযোগিতাই পারে মনশ্রীর জীবন বাঁচাতে।ইতিমধ্যেই বহু ব্যক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক সংস্থা ও সামাজিক সংগঠন মনশ্রীর চিকিৎসার জন্য অর্থসাহায্য করেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি প্রবাসী ত্রিপুরাবাসীরাও অনলাইনের মাধ্যমে অনুদান পাঠাচ্ছেন।

মানবিকতার এই স্রোত প্রতিদিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রবিবার ছোট্ট মনশ্রীকে নিয়ে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন তাঁর বাবা-মা। পশ্চিম ত্রিপুরার সাংসদ তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের উদ্যোগে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এ চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে পৌঁছে প্রথমে একাধিক রুটিন মেডিক্যাল পরীক্ষা, রোগের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন, বিভিন্ন নথিপত্রের যাচাই এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাব (এস্টিমেট কস্ট) তৈরি করা হবে।এরপরই চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ এবং মোট ব্যয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মনশ্রীর মা। এদিকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এস. দত্ত জানিয়েছেন, স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফি (SMA) অত্যন্ত বিরল হলেও প্রাণঘাতী রোগ। এই রোগের চিকিৎসায় প্রথম পর্যায়েই চারটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইনজেকশন প্রয়োজন হয়। এরপরও নির্দিষ্ট সময় অন্তর একই ধরনের ইনজেকশন দিতে হয়, যাতে ফুসফুসে সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়। ফলে চিকিৎসার খরচ শুধু প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। তাঁর মতে, শুধুমাত্র সামাজিক উদ্যোগ নয়, সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপও অত্যন্ত জরুরি।মনশ্রীর পাশাপাশি একই বিরল রোগে আক্রান্ত রয়েছে ধলাই জেলার কমলপুরের ছোট্ট শিশু ইপসিতা।

তাকেও বাঁচাতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মনশ্রী ও ইপসিতা, দুই নিষ্পাপ শিশুর জীবনরক্ষার লড়াই কোনো একটি পরিবারের একার দায়িত্ব নয়, এটি সমগ্র সমাজের মানবিক দায়িত্ব। একদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে কোটি টাকার ব্যয়ের চাপ, এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ ত্রিপুরা দেখিয়ে দিয়েছে মানবিকতার প্রকৃত শক্তি কী। রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্ম, জাতি কিংবা সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। প্রত্যেকটি ছোট অনুদান, প্রতিটি সহানুভূতির বার্তা, প্রতিটি প্রচার, সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে বেঁচে থাকার নতুন আশা। এখন সকলের প্রার্থনা একটাই, দিল্লিতে চিকিৎসার সমস্ত প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হোক, মনশ্রী সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। একইসঙ্গে কমলপুরের ইপসিতার জীবন বাঁচাতেও যেন একইভাবে এগিয়ে আসে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ। মানবিকতার এই সম্মিলিত শক্তিই হয়তো নতুন জীবন উপহার দিতে পারে দুই নিষ্পাপ শিশুকে।

You may also like

Leave a Comment