Home » Blog » মোবাইল আসক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

মোবাইল আসক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

মোবাইল আসক্তি, অভিমান ও এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত

by Planet Tripura
0 comments 4 views

মোবাইলের প্রতি আসক্তি, অভিমান আর এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, নিভে গেল এক সম্ভাবনাময় জীবন

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা : একটি বাড়ি, যেখানে হয়তো প্রতিদিন বই খুলে বসতো এক কিশোরী, খাতার পাতায় আঁকতো নতুন স্বপ্ন, গান গেয়ে ভরিয়ে রাখতো চারপাশ, সেই বাড়িতেই আজ নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। নবম শ্রেণির ছাত্রী মৃত্তিকা চৌধুরীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, সমাজের কাছেও এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিল, আমরা কি আমাদের সন্তানদের মন বুঝতে পারছি ?

মৃত্তিকার বাড়ি ছৈলেংটার গয়নামা গাওসভা এলাকায়। সে গাগড়াছড়া এইচ এস স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পরিবারের দাবি, পড়াশোনা, অঙ্কন ও সংগীতে সে ছিল অত্যন্ত মেধাবী এবং শুরু থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো ফল করে আসছিল। তবে পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তার মধ্যে ছিল কিছুটা আবেগপ্রবণতা, অল্পতেই অভিমান করা এবং মোবাইল ব্যবহারের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ। মৃতার পিতা তন্ময় চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, গত শুক্রবার বাবার মোবাইল ফোন নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছিল মৃত্তিকা।

কিছু প্রয়োজন থাকায় বাবা ফোনটি ফেরত চাইলে সে দিতে চায়নি। বিষয়টি নিয়ে বাবা-মা তাকে বকাঝকা করেন এবং পরে ফোন নিয়ে বাইরে যান।পরিবারের দাবি, কিছু সময় পর বাড়ি ফিরে এসে মেয়ের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন তারা। তখনই মৃত্তিকা জানায়, বাড়িতে রাখা ঘাস মারার ওষুধ খেয়ে ফেলেছে সে। পরিবার দ্রুত তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কুলাই জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

স্টমাক ওয়াশসহ চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য আগরতলার জিবিপি হাসপাতালে রেফার করা হয়। দুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাতে তার মৃত্যু হয় বলে পরিবার জানিয়েছে। চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিষক্রিয়া শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এই ঘটনার আরেকটি দিকও সমাজে নানা প্রশ্ন তুলছে। এমন মর্মান্তিক ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যদিও এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা তদন্তের তথ্য সামনে আসেনি, তাই এ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। শোক, আঘাত ও মানসিক বিপর্যয়ের প্রকাশ মানুষের ভেদে ভিন্ন হতে পারে, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ আবার অসাড় হয়ে যান।কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, এ মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। আজকের শিশু-কিশোররা বড় হচ্ছে এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে মোবাইল ফোন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, তা হয়ে উঠছে পরিচয়, সম্পর্ক, একাকীত্বের সঙ্গী, কখনও বা আবেগের আশ্রয়।

কিন্তু যখন সেই নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সামান্য বিরোধ, বকাঝকা বা অভিমানও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এখানে প্রশ্ন শুধু, মোবাইল আশীর্বাদ না অভিশাপ ? এটুকু নয়। প্রশ্ন আরও বড়, আমরা কি সন্তানদের সঙ্গে যথেষ্ট কথা বলছি ? তাদের মনখারাপ, চাপ, রাগ, একাকীত্ব, এসব কি গুরুত্ব দিয়ে শুনছি ?অনেক সময় বাবা-মায়ের উদ্দেশ্য থাকে শাসনের মাধ্যমে ভালো পথে রাখা, কিন্তু কিশোর বয়সের মানসিক পরিবর্তনের সময়ে সন্তানদের অনুভূতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকার চেয়ে বেশি জরুরি হতে পারে, আলোচনা, সীমা নির্ধারণ, সময় দেওয়া এবং আবেগের জায়গা তৈরি করা। একটি অভিমান, একটি আবেগঘন সিদ্ধান্ত, আর তারপর চিরতরে থেমে গেল এক কিশোরীর পথচলা। মৃত্তিকার মৃত্যু যেন আরেকটি পরিবারের ঘরে না পৌঁছায়, সেই দায় আমাদের সবার। সন্তানদের ফলাফল নয়, তাদের মনও পড়তে শিখতে হবে। কারণ কখনও কখনও, তুই ঠিক আছিস তো ? এমন একটি প্রশ্নও একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

You may also like

Leave a Comment