Home » Blog » ত্রিপুরায় ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি, ২০ স্থানে বিক্ষোভ

ত্রিপুরায় ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি, ২০ স্থানে বিক্ষোভ

দেশজুড়ে ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি, ত্রিপুরাতেও ব্যাপক সাড়া, রাজ্যের ২০টি স্থানে বিক্ষোভ, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ : সিআইটিইউ

by Planet Tripura
0 comments 2 views
tripura-jail-bharo-protest-citu-aiks-gmp-tkmu

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ১০ আগস্ট : কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নীতি ও বিভিন্ন জনবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশব্যাপী জেল ভরো কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে ত্রিপুরাতেও ব্যাপক কর্মসূচি পালন করল সিআইটিইউ, সারা ভারত কৃষক সভা (AIKS), গণমুক্তি পরিষদ (GMP) এবং ত্রিপুরা ক্ষেতমজুর ইউনিয়ন (TKMU)।সোমবার রাজ্যের আটটি জেলার বিভিন্ন মহকুমা ও এলাকায় মোট ২০টি স্থানে সংগঠিত এই কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, জুমিয়া, মহিলা, ছাত্র ও যুব অংশ নেন বলে দাবি আয়োজকদের।আগরতলাসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মসূচিকে ঘিরে ব্যাপক সাড়া পড়ে। কর্মসূচির পর সিআইটিইউ রাজ্য দপ্তরে আয়োজিত যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা দাবি করেন, মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ, রেগা-টুয়েপসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও জনজীবনের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমছিল।

সেই ক্ষোভই এদিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে। তাঁদের বক্তব্য, কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্বাধীন ডাবল ইঞ্জিন সরকারের বিভিন্ন নীতি ও ব্যর্থতার বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।সিআইটিইউ রাজ্য সাধারণ সম্পাদক শংকর প্রসাদ দত্ত বলেন, আটটি জেলার ২০টি জায়গায় হাজার হাজার মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তাঁর দাবি, পুলিশের কাছে জমা দেওয়া তালিকাতেই ২৩ হাজারের বেশি মানুষের নাম রয়েছে এবং সব মিলিয়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি হবে। সংবিধান, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়েই এই প্রতিবাদ বলে জানান তিনি। শংকর প্রসাদ দত্তের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সেই কারণেই মানুষ ঘরে বসে না থেকে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন।কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে সিআইটিইউ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সমর চক্রবর্তী আহত হয়েছেন এবং তাঁর হাতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন বলে জানান তিনি। এছাড়া কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এক ছাত্রী পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন এবং তাঁর চিকিৎসা হাসপাতালে চলছে বলেও সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়।

সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য সম্পাদক পবিত্র কর বলেন, কৃষক ও চাষিদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মহিলা এদিনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। জমিতে কাজ থাকার পরও কৃষকরা আন্দোলনে শামিল হয়েছেন বলে তাঁর দাবি।একইসঙ্গে একটি বেসরকারি নার্সিং হোমের সামনে ব্যারিকেড দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পবিত্র কর। তাঁর বক্তব্য, সেখানে পুলিশের ভূমিকা ছিল দুরভিসন্ধিমূলক এবং পুলিশের এই ধরনের আচরণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। গণমুক্তি পরিষদের রাজ্য সভাপতি রাধাচরণ দেববর্মা বলেন, কয়েক বছরের মধ্যে এমন অভূতপূর্ব সাড়া তাঁরা দেখেননি। জুমিয়া, দিনমজুর, ক্ষেতমজুর, মহিলা, পুরুষ, ছাত্র, যুব থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।

ভতাঁর দাবি, এডিসি এবং নন-এডিসি, দুই এলাকাতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। রাজ্যের পাশাপাশি এডিসি প্রশাসনের বিরুদ্ধেও মানুষের ক্ষোভ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রাধাচরণ দেববর্মার বক্তব্য, জুমিয়া, কৃষক, ছাত্র-যুবসহ বিভিন্ন অংশের মানুষের সমস্যার সমাধানে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। এই ক্ষোভের কারণেই মানুষ আন্দোলনের ময়দানে নেমেছেন। আগামী দিনে এই আন্দোলন আরও প্রসারিত করা হবে বলেও জানান তিনি। ত্রিপুরা ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদক শ্যামল দে বলেন, কর্মসূচিতে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ঘটেছে বলে তাঁদের ধারণা। সমস্ত ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তাঁর কথায়, এদিনের কর্মসূচিতে গণশক্তির সংগ্রামের মেজাজ স্পষ্ট হয়েছে। সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ যে কতটা গভীর, এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। সরকার যে ভাষা বোঝে, জনতা সেই ভাষাতেই নিজেদের প্রতিবাদের বার্তা দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শ্যামল দে। সিআইটিইউ রাজ্য সভাপতি মানিক দে বলেন, এদিনের কর্মসূচি রাজ্যবাসীর তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর দাবি, কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণবিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।মানিক দে বলেন, রাজ্যের বিদ্যুৎ সমস্যা, কর্মসংস্থানের সংকট, রেগা ও টুয়েপের কাজসহ বিভিন্ন জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ। পাশাপাশি দুর্নীতি, লুটপাট এবং আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য, দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, ত্রিপুরাতেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। কেন্দ্রীয় সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় না বসে মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মানিক দে আরও বলেন, চারটি সংগঠন শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা জানিয়েছিল এবং ত্রিপুরার মানুষ এদিন শান্তিপূর্ণভাবেই নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আগামী দিনে সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে আরও বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন সিআইটিইউ রাজ্য সভাপতি মানিক দে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত সংগঠনগুলির মূল দাবি ছিল অর্থনৈতিক এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু সরকার যদি মানুষের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে আগামী দিনে আন্দোলন রাজনৈতিক দাবির দিকেও মোড় নিতে পারে।

মানিক দে বলেন, সরকার যদি নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না করে এবং মানুষের সমস্যার সমাধান না করে, তাহলে আগামী দিনে সরকার পাল্টাও-এর মতো রাজনৈতিক স্লোগান সামনে আসতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত সরকারের ভবিষ্যৎ ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। অর্থাৎ, এদিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলির আন্দোলন আরও জোরদার করার পাশাপাশি ত্রিপুরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপরও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে নেতারা দাবি করেন, ত্রিপুরার কর্মসূচি বিচ্ছিন্ন কোনও আন্দোলন নয়। দেশজুড়ে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর ও বিভিন্ন গণসংগঠনের যে প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে রাজ্যেও ব্যাপক সাড়া মিলেছে। জাতীয় স্তরের বিভিন্ন দাবির পাশাপাশি ত্রিপুরার নিজস্ব সমস্যা বিদ্যুৎ পরিষেবা, কর্মসংস্থান, রেগা ও টুইপের কাজ, কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের সমস্যা, দুর্নীতি এবং আইনের শাসন নিয়ে অভিযোগ, এসব বিষয়ও আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

চারটি সংগঠনের নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, এদিনের ‘জেল ভরো’ কর্মসূচিকে তাঁরা আগামী দিনের আরও বৃহত্তর গণআন্দোলনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় যে সাড়া মিলেছে, তাতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সিআইটিইউ নেতৃত্ব জানিয়েছেন, আগামী দিনে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সংগঠনগুলি বৈঠকে বসে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবে। আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে এদিনের কর্মসূচির পর ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে চাপের আবহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, অন্যদিকে রাজ্যের বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান, রেগা-টুয়েপ, দুর্নীতি ও জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক ও গণসংগঠনগুলির লাগাতার প্রতিবাদ, সব মিলিয়ে রাজ্য সরকারের ওপরও চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এখন দেখার, চারটি সংগঠনের এই আন্দোলনের পর সরকার মানুষের উত্থাপিত দাবিগুলির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে কিনা। অন্যদিকে, সংগঠনগুলির ঘোষণামতো আগামী দিনে যদি আরও বৃহত্তর কর্মসূচি নেওয়া হয়, তাহলে ত্রিপুরার রাজনীতিতে শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর ও গণসংগঠনগুলির আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে পারে।

You may also like

Leave a Comment