Home » Blog » পশ্চিম পিলাক স্কুলে ৭ ছাত্রকে মারধরের অভিযোগ

পশ্চিম পিলাক স্কুলে ৭ ছাত্রকে মারধরের অভিযোগ

পশ্চিম পিলাকে ছাত্রদের মারধরের অভিযোগ, শিক্ষাঙ্গনে শাসনের নামে সহিংসতা, শিক্ষিকার ভূমিকায়ভক্ষুব্দ অভিভাবক মহল

by Planet Tripura
0 comments 2 views
west-pilak-school-students-assault-allegation

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ১০ আগস্ট : বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু পাঠ গ্রহণের জায়গা নয়, একই সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।অথচ সেই শিক্ষাঙ্গনেই যদি শাসনের নামে ছাত্রছাত্রীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষার পরিবেশ কতটা নিরাপদ ? শাসন ও শাস্তির সীমারেখা কোথায় ? আর একজন শিক্ষক বা বিদ্যালয়ের কর্মীর কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা ঠিক কেমন আচরণ প্রত্যাশা করতে পারে?জোলাইবাড়ীর পশ্চিম পিলাক দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়কে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমনই একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। অভিযোগ, গত শনিবার বিদ্যালয়ের সাতজন ছাত্রকে মারধর করেন বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষিকা কৃষ্ণা মজুমদার এবং ক্লার্ক কৃষ্ণ লোধ।অভিভাবকদের অভিযোগ, ক্লার্ক কৃষ্ণ লোধ ছাত্রদের যত্রতত্র লাথি মারেন। এর ফলে কয়েকজন ছাত্রের বুক ও পেটে আঘাত লাগে এবং তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে ছাত্রদের জোলাইবাড়ী সামাজিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয় বলে জানা গেছে। ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার বিদ্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ দেখান অভিভাবকরা।

তাঁদের বক্তব্য, কোনও ছাত্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ থাকলে প্রথমে বিষয়টি অভিভাবকদের জানানো উচিত ছিল। প্রয়োজন হলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে পারত। কিন্তু তার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন তাঁরা। একসময় শিক্ষার্থীদের শাসন করার নামে শারীরিক শাস্তিকে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক বলে মনে করা হতো।শিক্ষক বকাঝকা করবেন, প্রয়োজনে শারীরিক শাস্তি দেবেন এমন ধারণাও সমাজের একটি অংশে ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে, শিক্ষাব্যবস্থার ধারণাও বদলেছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং বোঝানো, কাউন্সেলিং, আলোচনা এবং ইতিবাচক আচরণের মাধ্যমে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন শিক্ষার্থীর ভুলকে শুধরে দেওয়াই শিক্ষকের দায়িত্ব, তাকে অপমানিত, আতঙ্কিত বা শারীরিকভাবে আঘাত করা কোনওভাবেই শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছ থেকে তাই আরও বেশি সংবেদনশীলতা, ধৈর্য এবং দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের বয়স এমন একটি সময়, যখন তাদের মানসিক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে শিক্ষক বা বিদ্যালয়ের কোনও কর্মীর আচরণ তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকার ভূমিকা শুধুমাত্র বইয়ের পাঠ শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা এবং মূল্যবোধ গঠনের সহায়ক হিসেবে কাজ করতে হয়।

কোনও ছাত্র ভুল করলে প্রথমেই জানতে হবে কেন সে ভুল করেছে। তার পারিবারিক পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা পড়াশোনায় কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে সমাধানের চেষ্টা করাই হতে পারে অধিক কার্যকর পদ্ধতি। একজন শিক্ষক যদি ছাত্রের কাছে ভয় ও আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠেন, তাহলে সেই সম্পর্ক শিক্ষার পক্ষে ইতিবাচক নয়। বরং শিক্ষককে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে শিক্ষার্থী ভুল করলে তা স্বীকার করতে পারে, নিজের সমস্যা জানাতে পারে এবং সংশোধনের সুযোগ পায়। পশ্চিম পিলাকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, বিদ্যালয়ের পরিবেশে এমন কোনও ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব শুধু আক্রান্ত কয়েকজন ছাত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে কি ? অভিভাবকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রদের মারধরের ঘটনার পর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক তপন চক্রবর্তীর কাছে বিষয়টি জানানো হলে প্রতিবাদকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে টিসি দিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও এই বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছাত্রদের আক্রান্ত হওয়ার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মী বীরবাহাদুর ত্রিপুরা হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর বিজেপির দক্ষিণ জেলার আইটি সেলের ইনচার্জ সানাই বৈদ্য, মণ্ডলের আইটি ইনচার্জ নয়ন গোপ এবং এসএমসি কমিটির সহ-সম্পাদক সত্য দেবনাথের দিকে। তাঁদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের মোবাইল নিয়ে নেওয়া এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি দক্ষিণ জেলা পরিষদের সদস্য শম্ভু মানিক এবং স্থানীয় প্রধান বিদ্যুৎ দত্তের বিরুদ্ধেও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক বীরবাহাদুর।

এই অভিযোগগুলিরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সংবাদ সংগ্রহের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া যেমন উচিত নয়, তেমনই অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও কাম্য নয়। পশ্চিম পিলাক দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়ের ঘটনাতেও প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। ছাত্রদের শরীরে আঘাতের অভিযোগ সত্য কি না, কী পরিস্থিতিতে ঘটনাটি ঘটেছিল, কারা ছাত্রদের সঙ্গে শারীরিকভাবে দুর্ব্যবহার করেছিলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার পর কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং সাংবাদিককে হেনস্তা ও হুমকির অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রতিটি বিষয় তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। শুধু শিক্ষক বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের কথা বললেই বিষয়টি সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষার্থীর আচরণ, পড়াশোনা এবং মানসিক বিকাশে অভিভাবকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উঠলে অভিভাবকদেরও প্রথমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, সন্তানের বন্ধু-বান্ধব, পড়াশোনা ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সমস্যা দেখা দিলে শিক্ষক-অভিভাবক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনও শিক্ষক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা নিয়ে উত্তেজনা না বাড়িয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা দপ্তর কিংবা আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগ জানানোই হওয়া উচিত সঠিক পথ।

শিক্ষার্থীদের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই দায়িত্বও রয়েছে।বিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে চলা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মান করা, সহপাঠীদের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা এবং কোনও সমস্যা হলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন। তবে শিক্ষার্থীর কোনও ভুল বা অপরাধ থাকলেও তার সংশোধনের পদ্ধতি হতে হবে শিক্ষামূলক ও মানবিক। শারীরিক আঘাত কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। পশ্চিম পিলাকের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, শিক্ষাঙ্গনে যদি ছাত্রছাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে বিদ্যালয়মুখী হওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে ভয় তৈরি হতে পারে।
একটি বিদ্যালয়ের আসল শক্তি তার ভবন নয়, সেখানে তৈরি হওয়া নিরাপদ, মানবিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। তাই পশ্চিম পিলাকের ঘটনাটি কেবল কয়েকজন ছাত্রকে মারধরের অভিযোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, অভিভাবকদের ভূমিকা, শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার মানসিকতার প্রশ্ন।
শিক্ষার উদ্দেশ্য ভয় সৃষ্টি করা নয়, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা। শাসনের উদ্দেশ্য আঘাত করা নয়, ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা। তাই অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে কোনও বিদ্যালয়ে শাসনের নামে শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এখন দেখার বিষয়, পশ্চিম পিলাক দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলির বিষয়ে রাজ্য সরকার ও শিক্ষা দপ্তর কী পদক্ষেপ নেয় এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

You may also like

Leave a Comment