নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ১০ আগস্ট : স্মার্ট মিটার বাতিল, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি, রিচার্জে অনিয়ম এবং বিদ্যুৎ পরিষেবার নানা সমস্যার প্রতিবাদে সোমবার দিনভর উত্তাল হয়ে রইল কুমারঘাট মহকুমার ফটিকরায়ের কাঞ্চনবাড়ি বিদ্যুৎ দপ্তর। সকাল দশটা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমশ তীব্র আকার নেয়। স্থানীয় সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেন ব্যাটারিচালিত গাড়ি ও ই-রিকশা চালকরাও। দীর্ঘক্ষণ দপ্তরের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভ চলার পর সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন ও বিদ্যুৎ দপ্তরের লিখিত আশ্বাসে রাত প্রায় ৯টা নাগাদ সাময়িকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন বিক্ষোভকারীরা।আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, স্মার্ট মিটার চালুর পর থেকেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে মিটারে টাকা কাটার হিসাবের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই রিচার্জের টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বহু গ্রাহক। এর সঙ্গে মিটার রেন্ট, ফিক্সড চার্জ এবং অন্যান্য বিভিন্ন চার্জ যুক্ত হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দিনভর গাড়ি চালিয়ে সংসার চালানো ব্যাটারিচালিত গাড়ি ও ই-রিকশা চালকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খরচের এই বাড়তি চাপ জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।
সকাল থেকে কাঞ্চনবাড়ি বিদ্যুৎ দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ চললেও দীর্ঘক্ষণ কোনও কার্যকর সমাধানের আশ্বাস না মেলায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার দিকে ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা দপ্তরের সামনের প্রধান সড়ক অবরোধ করেন।পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ারও উপক্রম হয়। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ ও টিএসআর বাহিনী। উপস্থিত ছিলেন মহকুমা পুলিশ আধিকারিক ডেভিড চাকমা, বিদ্যুৎ দপ্তরের ডিজিএম আশীষ বণিক, এজিএম নিতাই দেববর্মা, ডিসিএম, সিনিয়র ম্যানেজার, ফটিকরায় থানার ওসি-সহ প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের অন্যান্য আধিকারিকরা। পরে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিদ্যুৎ দপ্তরের আধিকারিকরা। বৈঠকে ডিজিএম আশীষ বণিক, এজিএম নিতাই দেববর্মা এবং কাঞ্চনবাড়ি বিদ্যুৎ দপ্তরের সিনিয়র ম্যানেজারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের লিখিত আশ্বাস দেওয়া হয়। অস্বাভাবিক ও অন্যায্য বিদ্যুৎ বিল, স্মার্ট মিটারে দ্রুত টাকা কেটে যাওয়ার অভিযোগ এবং রিচার্জ সংক্রান্ত সমস্যাগুলি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়।পাশাপাশি স্মার্ট মিটারের বিভিন্ন চার্জ ও রিচার্জ সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। গ্রাহকদের অযথা হয়রানি না করা এবং তাঁদের অভিযোগ শোনা ও সমাধানের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
এই লিখিত আশ্বাস এবং মহকুমা পুলিশ আধিকারিক ও ডিসিএমের মধ্যস্থতায় রাত প্রায় ৯টা নাগাদ পথঅবরোধ ও বিক্ষোভ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেন আন্দোলনকারীরা। তবে তাঁদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, লিখিত প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর গণআন্দোলনে নামবেন তাঁরা।কাঞ্চনবাড়ির ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এমনটাই মনে করছেন বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে সরব বিভিন্ন মহলের একাংশ। স্মার্ট মিটার, অস্বাভাবিক বিল, রিচার্জের টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ জমছে। কোথাও গ্রাহকেরা দপ্তরে গিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন, কোথাও বিক্ষোভ-আন্দোলনের পথ বেছে নিচ্ছেন। ফলে বিদ্যুৎ পরিষেবা এখন শুধু দৈনন্দিন নাগরিক পরিষেবার বিষয় নয়, ক্রমশ জনঅসন্তোষের অন্যতম বড় ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। একদিকে বিদ্যুতের বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ, অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা, দুইয়ের জেরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে।গ্রাহকদের প্রশ্ন, নিয়মিত বিদ্যুৎ পরিষেবা না পাওয়া সত্ত্বেও যদি বিলের বোঝা বাড়তে থাকে, তাহলে স্মার্ট মিটার চালুর সুফল কোথায় ? স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিলিং ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করার কথা থাকলেও বাস্তবে গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে উল্টো বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে কেন এই প্রশ্নও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ এবং বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ পরিষেবা, স্মার্ট মিটার এবং বিল সংক্রান্ত সমস্যাগুলি নিয়ে সরকার ও দপ্তরের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
ফলে প্রশাসনিক আশ্বাসের পরিবর্তে বাস্তব পরিষেবার উন্নতি চান সাধারণ মানুষ।কাঞ্চনবাড়ির ঘটনায় শেষ পর্যন্ত লিখিত আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও, এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় সেটিই এখন দেখার। কারণ আন্দোলনকারীরা ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গড়িমসি হলে ফের রাস্তায় নামবেন তাঁরা। রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে কাঞ্চনবাড়ির আন্দোলন তাই সরকারের কাছে নতুন করে সতর্কবার্তা। স্মার্ট মিটার নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিলের অস্বচ্ছতা এবং ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান না হলে এই ক্ষোভ আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।