ত্রিপুরা প্রতিনিধি, আগরতলা ৮ জুলাই : ত্রিপুরা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ (এজিএমসি) ও জিবি পন্ত হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস বন্ধ করার ঘোষণা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে সেই সিদ্ধান্ত এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কারণ, মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদনের পরও এ বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি বিজ্ঞপ্তি, বাস্তবায়নের নির্দেশিকা কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো এখনও প্রকাশিত হয়নি। ফলে চিকিৎসকদের একাংশ পুনরায় ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করেছেন। এজিএমসি টিচার্স ফোরামের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে আপাতত এই ব্যবস্থা চালু থাকছে বলে জানা গেছে। প্রসঙ্গত, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার মানোন্নয়ন এবং চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টায় সম্পূর্ণভাবে সরকারি পরিষেবায় যুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে রাজ্য মন্ত্রিসভা সম্প্রতি জিবি পন্ত হাসপাতাল ও এজিএমসির চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে চিকিৎসকরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে স্বেচ্ছায় তাঁদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত নির্দেশিকা প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে এজিএমসি টিচার্স ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকরা চাইলে পুনরায় ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে পারবেন। একইসঙ্গে যাঁরা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখতে চান, তাঁদের জন্যও সেই সুযোগ রাখা হয়েছে। টিচার্স ফোরামের এক পদাধিকারী জানান, বহু রোগী দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হঠাৎ করে চেম্বার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছিল। রোগীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সরকার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করলেই চিকিৎসকরা তা মেনে চলবেন। রাজ্যের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসক মহলের একাংশের মতে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করলেই সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা উন্নত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ওষুধ সরবরাহ, পর্যাপ্ত শয্যা এবং রোগী ব্যবস্থাপনার উন্নত ব্যবস্থা। জিবি পন্ত হাসপাতাল ইতিমধ্যেই রাজ্যের সর্ববৃহৎ রেফারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন হাজার হাজার বহির্বিভাগের রোগী এবং শত শত ভর্তি রোগীর চাপ সামলাতে হয়। এর মধ্যেই যদি সমস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শুধুমাত্র সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন এবং ব্যক্তিগত চেম্বার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে রোগীর চাপ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্য মহলের মতে, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নতুন ভবন, অতিরিক্ত ওয়ার্ড, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, পর্যাপ্ত জনবল এবং ডিজিটাল রোগী ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধুমাত্র প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে প্রসূতি মা, গর্ভবতী মহিলা এবং নবজাতক চিকিৎসা পরিষেবা। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা থেকে বহু গর্ভবতী মহিলা নির্দিষ্ট স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের ব্যক্তিগত চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসা নেন। সেই চিকিৎসকরাই পরবর্তীতে তাঁদের অস্ত্রোপচার বা জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
হঠাৎ করে ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ হয়ে গেলে সেই ধারাবাহিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা, বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা, নবজাতকের জটিল রোগ এবং সুপার-স্পেশালিটি পরিষেবার ক্ষেত্রে রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ।ত্রিপুরার অধিকাংশ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য জিবি পন্ত হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হলেও বাস্তবতা হলো, রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের পক্ষে প্রতিটি চিকিৎসার জন্য আগরতলায় বারবার আসা সহজ নয়। ধলাই, উত্তর ত্রিপুরা, উনকোটি, গোমতী, দক্ষিণ ত্রিপুরা কিংবা সিপাহিজলা জেলার বহু মানুষকে কয়েকশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আগরতলায় পৌঁছাতে হয়। যাতায়াত ব্যয়, থাকার ব্যবস্থা, কর্মদিবস নষ্ট হওয়া, সব মিলিয়ে এই চিকিৎসা অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।অন্যদিকে, সবার পক্ষে সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে প্রাইভেট চিকিৎসা করানোও সম্ভব নয়। ফলে সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার, দুই ব্যবস্থাই এতদিন পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন বহু স্বাস্থ্য বিশ্লেষক।
চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার সময় জিবি পন্ত হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে হাসপাতাল সূত্রের দাবি। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নেওয়া, অপেক্ষার সময় বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন বিভাগে অতিরিক্ত ভিড়ের অভিযোগও উঠে আসে। যদিও সরকারি স্তরে এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি, তবুও হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক ও কর্মীদের মতে রোগীর চাপ দৃশ্যত বেড়েছিল। সুপার-স্পেশালিটি বিভাগের বহু চিকিৎসক সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সুপার-স্পেশালিটি পরিষেবার জন্য বহু রোগী দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ব্যক্তিগত চেম্বার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে সেই চিকিৎসা ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসক সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে, অন্যান্য সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো। ২০ শতাংশ নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স (এনপিএ)-এর কার্যকর বাস্তবায়ন। স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী পদোন্নতি নীতি। মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস রুলসে প্রয়োজনীয় সংশোধন। কর্মপরিবেশ ও গবেষণার উন্নয়ন। স্বাস্থ্য সচিব তাঁদের দাবিগুলি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে চিকিৎসক মহল সূত্রে জানা গেছে।এদিকে মুখ্যমন্ত্রী আগেই স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে না। সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পরই জিবি পন্ত হাসপাতাল ও এজিএমসির চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসকদের জন্য ২০ শতাংশ নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স দেওয়ার বিষয়েও সরকার নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। ত্রিপুরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে জনমতও বিভক্ত।
একাংশের মতে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের পূর্ণসময়ের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে সাধারণ মানুষ আরও উন্নত পরিষেবা পাবেন। অন্যদিকে অনেকের প্রশ্ন, যদি এই নীতি সত্যিই জনস্বার্থে হয়, তবে তা শুধু জিবি পন্ত হাসপাতাল ও এজিএমসির চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেই কেন প্রযোজ্য হবে? অন্য সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে না কেন, এই প্রশ্নও উঠছে। আবার বহু রোগী ও তাঁদের পরিবার মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নেওয়া নির্দিষ্ট চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে এবং সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত চেম্বার চালু রাখার যে অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত এজিএমসি টিচার্স ফোরাম নিয়েছে, তাতে বহু রোগী স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, গর্ভবতী মা, শিশু, ক্যানসার, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন সুপার-স্পেশালিটি বিভাগের রোগীদের কাছে এই সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের আগে হাসপাতালের অবকাঠামো, মানবসম্পদ, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং জেলা হাসপাতালগুলিকে আরও শক্তিশালী করা সমান জরুরি। অন্যথায় সমস্ত রোগীর চাপ যদি একমাত্র জিবি হাসপাতালের ওপর এসে পড়ে, তবে পরিষেবার মান উন্নত হওয়ার পরিবর্তে উল্টো চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ফলে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে সরকার কী ধরনের বাস্তবায়ন রূপরেখা ঘোষণা করে, চিকিৎসকদের দাবিগুলির কতটা সমাধান করে এবং একই সঙ্গে সাধারণ রোগীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত রাখে, এখন সেদিকেই নজর রাজ্যের স্বাস্থ্য মহল ও সাধারণ মানুষের।