Home » Blog » ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য ড: দেবব্রত দাস

ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য ড: দেবব্রত দাস

দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক স্থবিরতার অবসান; গবেষণা, স্বচ্ছ প্রশাসন, সময়মতো পরীক্ষা ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ার চ্যালেঞ্জ নতুন উপাচার্যের সামনে।

by Planet Tripura
0 comments 34 views
tripura-university-new-vice-chancellor-prof-debabrata-das

ত্রিপুরা প্রতিনিধি, আগরতলা ৮ জুলাই : দীর্ঘ কয়েক মাসের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন অধ্যাপক ড. দেবব্রত দাস।সূর্যমানিনগরস্থিত ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শ্যামল দাস, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক, গবেষক, আধিকারিক ও কর্মচারীরা। একজন স্থায়ী উপাচার্যের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব ফিরে আসায় স্বস্তি ফিরেছে বিশ্ববিদ্যালয় মহলে। দীর্ঘদিন নিয়মিত উপাচার্য না থাকায় যে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তাতে বহু গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঝুলে ছিল। নতুন উপাচার্যের যোগদানের মাধ্যমে সেই অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানকে নতুন গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশা করছেন শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, গবেষক এবং কর্মচারীরা।তবে শুধু একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়, ড. দেবব্রত দাসের কাঁধে এখন রয়েছে ত্রিপুরার সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হারানো ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের দায়িত্ব। কারণ গত কয়েক বছরে একের পর এক বিতর্ক, প্রশাসনিক অস্থিরতা, অভিযোগ, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়। ড. দেবব্রত দাস উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিন দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতার অধিকারী। তিনি রাজীব গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (DRS-I) সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে।

এছাড়াও ইউজিসি, আইসিএসএসআর, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রক, ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে একাধিক গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।ভারত-ফ্রান্স সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির আওতায় ফ্রান্সে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করেছেন। ফোর্ড ফাউন্ডেশন সমর্থিত মাইক্রোফাইন্যান্স রিসার্চার্স অ্যালায়েন্সের ফেলো হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণাপত্র ৬৫টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। দুটি গ্রন্থ রচনা এবং একাধিক সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি অরুণাচল প্রদেশ প্রাইভেট এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন রেগুলেটরি কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি LEAP-এর আওতায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Saïd Business School-এ সিনিয়র অ্যাকাডেমিক লিডারশিপ প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই এখন ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ এই বিশ্ববিদ্যালয়।

শত শত কলেজ শিক্ষক, হাজার হাজার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, গবেষক, পরীক্ষার্থী এবং রাজ্যের প্রায় সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি ডিগ্রি কলেজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও রাজ্যের উচ্চশিক্ষার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই কারণেই নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, এটি এক অর্থে সমগ্র রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলারও দায়িত্ব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে একাধিকবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক ও অধ্যাপক নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলিতে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সময়মতো ভর্তি, কাউন্সেলিং এবং আসন বণ্টন নিয়ে বারবার বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্যালেন্ডার বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় বহু শিক্ষার্থীর চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণা প্রকল্প, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নতুন গবেষণাগার এবং উদ্ভাবনী কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সক্রিয় করার দাবি দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার দাবি তুলেছেন শিক্ষক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে, তবুও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রী শ্লীলতাহানির অভিযোগ রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছাত্রীদের নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির কার্যকারিতা এবং ক্যাম্পাস নজরদারি আরও শক্তিশালী করার দাবি জোরালো হয়।

নতুন উপাচার্যের সামনে এই বিষয়টিও অত্যন্ত সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় বহুবার ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে।কখনও ফল প্রকাশে বিলম্ব, কখনও ভর্তি, কখনও শিক্ষক নিয়োগ, কখনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে নেমেছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও কম ছিল না। বিরোধী দলগুলি বহুবার অভিযোগ করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘাতও তৈরি হয়েছে। শাসক ও বিরোধী, উভয় পক্ষই বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রেখে একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা নতুন উপাচার্যের অন্যতম বড় পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের বড় অংশ মনে করছেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হবে নতুন উপাচার্যের প্রথম কাজ।কর্মচারীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা পদোন্নতি, নিয়োগ, পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা এবং প্রশাসনিক জটিলতার দ্রুত সমাধান হবে।

গবেষকদের দাবি, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণা অনুদান বৃদ্ধিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হোক।ছাত্রছাত্রীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সময়মতো পরীক্ষা, নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ, স্বচ্ছ ভর্তি ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রশাসন, নিরাপদ ক্যাম্পাস, উন্নত গ্রন্থাগার ও গবেষণা সুবিধা, আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষা, জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী কার্যকর পাঠক্রম।শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়কে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে একজন ছাত্র ভর্তি হওয়া থেকে ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক হয়রানির শিকার না হন।ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজ রয়েছে। এসব কলেজে শিক্ষক সংকট, পরীক্ষা, পাঠ্যক্রম, ফল প্রকাশ, সিলেবাস বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, সব ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন উপাচার্যের কাছে কলেজগুলিও আশা করছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে।শিক্ষাবিদদের মতে, ড. দেবব্রত দাসের সামনে কয়েকটি বিষয় অবিলম্বে গুরুত্ব পাওয়া উচিত, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, দ্রুত একাডেমিক ক্যালেন্ডার স্বাভাবিক করা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে নতুন উদ্যোগ, ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, ছাত্রবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন ইত্যাদি।ড. দেবব্রত দাস এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, যখন ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে, অন্যদিকে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

তাঁর শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা, গবেষণার সাফল্য এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক দিক। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁকে সামাল দিতে হবে আস্থার সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা এবং রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব। শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নয়, ত্রিপুরার উচ্চশিক্ষাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া, গবেষণার পরিবেশকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ছাত্রবান্ধব প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, এই চারটি লক্ষ্য পূরণ করতে পারলেই ড. দেবব্রত দাসের মেয়াদ ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন নজর থাকবে, নতুন উপাচার্যের নেতৃত্বে বিতর্কের পরিবর্তে সাফল্য, স্থবিরতার পরিবর্তে গতি এবং অনিশ্চয়তার পরিবর্তে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় কতটা সফল হয়।

You may also like

Leave a Comment