Home » Blog » TWJA-র রক্তদান কর্মসূচি

TWJA-র রক্তদান কর্মসূচি

টিডব্লিউজেএ-র অধিবেশনে সাংবাদিকদের অধিকার ও রক্তদান কর্মসূচি

by Planet Tripura
0 comments 19 views
টিডব্লিউজেএ-র অধিবেশনে সাংবাদিকদের অধিকার ও রক্তদান কর্মসূচি

রক্তদান থেকে সাংবাদিকদের অধিকার, টিডব্লিউজেএ-র বিশেষ অধিবেশনে একমঞ্চে মানবসেবা, পেশাগত সংকট ও সরকারের আশ্বাস

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৪ জুলাই : একদিকে স্বেচ্ছায় রক্তদান, অন্যদিকে সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া, সংবাদপত্র শিল্পের আর্থিক সংকট, সাংবাদিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারি বিজ্ঞাপন নীতির পুনর্বিবেচনা, নিয়োগপত্র, আবাসন ও পেনশন বৃদ্ধির দাবি, সব মিলিয়ে ত্রিপুরা ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (টিডব্লিউজেএ)-এর পশ্চিম জেলা কমিটির বিশেষ অধিবেশন শনিবার কার্যত সাংবাদিক সমাজের বর্তমান বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে উঠল।আগরতলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে ২৫ জন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।

একইসঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা এবং সংবাদপত্র শিল্পের টিকে থাকার প্রশ্নে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে বক্তাদের বক্তব্যে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা, খাদ্য ও জনসংভরণ দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী, স্যন্দন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিক সুবল কুমার দে, আগরতলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি প্রণব সরকার, টিডব্লিউজেএ-র সভাপতি বিজয় পাল, সাধারণ সম্পাদক সুনীল দেবনাথ, বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক, প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিক এবং সংবাদকর্মীরা।

জিবি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের চিকিৎসক ও প্রযুক্তিবিদদের তত্ত্বাবধানে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় অতিথিদের চারা গাছে জলসিঞ্চনের মাধ্যমে। পরিবেশ রক্ষা ও সমাজসেবার প্রতীক হিসেবে এই কর্মসূচিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।অনুষ্ঠানের সূচনাতেই টিডব্লিউজেএ-র সাধারণ সম্পাদক সুনীল দেবনাথ গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সংগঠনের পশ্চিম জেলা কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তিনি জানান, সংগঠনকে আরও সক্রিয় ও গতিশীল করে তুলতে নতুনভাবে সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। সাংবাদিকদের বৃহত্তর স্বার্থে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। সুনীল দেবনাথ তাঁর বক্তব্যে সাংবাদিকদের অন্যতম বড় সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এখনও রাজ্যের বহু সাংবাদিক কোনও আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।

তিনি দাবি জানান, সমস্ত সাংবাদিককে লিখিত নিয়োগপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।সাংবাদিকদের শ্রমিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত না হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের অবসরকালীন ভাতা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর দাবি, সাংবাদিক পেনশন ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা করা হউক।
সংগঠনের তরফে ভূমিহীন সাংবাদিকদের জন্য আবাসন প্রকল্প চালুর দাবিও জানানো হয়।বক্তার মতে, বহু সাংবাদিক আজও নিজস্ব বাসস্থানের অভাবে ভুগছেন। সরকারি আবাসন প্রকল্পে সাংবাদিকদের জন্য পৃথক সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।দীর্ঘদিন পেশার সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের আবাসনের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে, আগরতলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি প্রণব সরকার বলেন, সাংবাদিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সাংবাদিকবান্ধব মনোভাব নিয়ে কাজ করেছে।অতীতের তুলনায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন দাবি পূরণ হয়েছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আগরতলা প্রেস ক্লাবের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ বজায় রেখেছে। তবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এখনও অনেক কাজ বাকি।

তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান, সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প আরও শক্তিশালী করার কথাও বলেন তিনি। সংবাদ সংগ্রহের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান তিনি। রাজ্যের বরিষ্ঠ সাংবাদিক স্যন্দন সম্পাদক সুবল কুমার দে তাঁর বক্তব্যে একদিকে রক্তদান আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করেন, অন্যদিকে সংবাদপত্র শিল্পের গভীর অর্থনৈতিক সংকট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একসময় রক্তদানের প্রতি মানুষের ভয় ছিল। আজ পরিস্থিতি বদলেছে।সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করছেন। এটি সামাজিক সচেতনতার বড় পরিবর্তন। তিনি বলেন, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত সমাজসেবামূলক কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করা।

এরপর তিনি সংবাদপত্র শিল্পের আর্থিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সর্বশেষ সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়। তারপর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও নতুন করে কোনও মূল্য সংশোধন হয়নি। অথচ সংবাদপত্র ছাপানোর কাগজ, নিউজপ্রিন্ট, কালি, প্লেট, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ, পরিবহণ ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় কয়েকশো গুণ বেড়েছে।অনেক সংবাদপত্র বর্তমানে আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞাপনের হার বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সাংবাদিকদের পরিবারও সাধারণ মানুষের মতো একই বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে জীবনযাপন করেন। কিন্তু আয়ের ক্ষেত্রে তাঁরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন।সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে।

তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান, বিজ্ঞাপন নীতির অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা, সংবাদপত্র শিল্পের আর্থিক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংবাদপত্রের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ, সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা সাংবাদিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া মনোযোগ দিয়ে শোনেন। শেষে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। তিনি আরও জানান, সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সরকারি বিজ্ঞাপন নীতি পর্যালোচনার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে। সাংবাদিকদের পেনশন, আবাসন ও অন্যান্য কল্যাণমূলক দাবির দিকেও নজর দেওয়া হবে। সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার স্বার্থে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়, সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করাও তাঁদের দায়িত্বের অংশ। তাই তাঁদের সমস্যাগুলিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। তবে সাংবাদিকদের সমস্ত সংগঠনকে এক ছাতার নীচে এসে দাবী দাওয়ার বিষয়ে সঠিক রুপরেখা চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হলে সরকার ১০০ শতাংশ না পারলেও ৯০ শতাংশ পুরন করতে বদ্ধপরিকর।

খাদ্য ও জনসংভরণ দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে সাংবাদিকদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সমস্যা, প্রশাসনিক ত্রুটি এবং সমাজের নানা বাস্তব চিত্র উঠে আসে। ফলে সাংবাদিকদের কাজকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, সাংবাদিক সমাজের দাবি-দাওয়া যৌক্তিক হলে তা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। একইসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী ২৫ জন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীকে সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মান জানানো হয়। আয়োজকদের মতে, রক্তদান শুধু একটি মানবিক কাজ নয়, এটি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতারও প্রতীক।

বক্তারা বলেন, রক্তের কোনও বিকল্প নেই। নিয়মিত রক্তদান সমাজে সচেতনতা বাড়ায়। সাংবাদিক সমাজ যদি এই ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসে, তবে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই মনে করেন, সাংবাদিকদের এই মানবিক উদ্যোগ পেশাগত দাবির পাশাপাশি সমাজের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধকেও আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষ অধিবেশনে বক্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সাংবাদিক সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। বিশেষ করে, নিয়োগপত্রের অভাব, কম বেতন ও অনিয়মিত পারিশ্রমিক, পেনশন ও অবসরকালীন সুরক্ষার ঘাটতি, আবাসনের সমস্যা, সংবাদপত্র শিল্পের আর্থিক সংকট, সরকারি বিজ্ঞাপন নীতির জটিলতা। এই সব বিষয় সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনে বড় চাপ তৈরি করছে।

বক্তারা মনে করেন, সাংবাদিকদের দাবি শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার প্রশ্ন নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও টিকে থাকার প্রশ্নের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত। সবশেষে সংগঠনের পক্ষে সভাপতি বিজয় পাল অতিথিদের ধন্যবাদ জানান। তিনি জানান, সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণের প্রশ্নে টিডব্লিউজেএ ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন ও আলোচনা চালিয়ে যাবে। অনুষ্ঠান শেষে রক্তদাতাদের হাতে স্মারক ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।সারাদিনব্যাপী এই বিশেষ অধিবেশন একদিকে যেমন মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, অন্যদিকে সাংবাদিক সমাজের বাস্তব সংকট ও প্রত্যাশার কথাও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

You may also like

Leave a Comment