বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে মুখ্যমন্ত্রীর পৌরহিত্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, তবে মাটির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা : ত্রিপুরায় বিদ্যুৎ পরিষেবার করুণ বাস্তবতার মাঝেই আবারও উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতি। মুখ্যমন্ত্রী ডা: মানিক সাহার সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে আধুনিক করার কথা জোর দিয়ে বলা হলেও, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প।
বিদ্যুৎ দপ্তরের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী রতন লাল নাথ এবং দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা। বৈঠকে উন্নয়নমূলক প্রকল্প, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবার কৌশল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও, প্রশ্ন উঠছে, এই আলোচনা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ ? কারণ, বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
রাজধানী আগরতলা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল সাধারণ মানুষ। ঝর নেই বৃষ্টি নেই চলে যাচ্ছে কারেন্ট। বিদ্যুৎ নিগমের অফিসগুলিতে ফোন করলে রিসিভ করার লোক নেই, ইমার্জেন্সি ফল্ট রেকটিফিকেশান নম্বর গুলিতে ফোন করলে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন সারাইয়ে কেউ আসছেন না।
খোদ রাজধানী শহরে এমন দৃশ্য পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দিনের পর দিন স্থায়ী বিদ্যুৎ সমস্যা, যা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে বলেই অভিযোগ। শুধু আলো নয়, বিদ্যুতের অভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে পানীয় জলের সরবরাহও। ফলে একদিকে অন্ধকার, অন্যদিকে জলসংকট দু’দিকেই চাপে সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে বিক্ষোভ, পথ অবরোধ, বিদ্যুৎ অফিসে তালা ঝোলানো, এমনকি ক্ষুব্ধ জনতার হাতে দপ্তরের কর্মীরা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে আসছে।
বিরোধীদের সরাসরি অভিযোগ, ভারতীয় জনতা পার্টি সরকারের গত আট বছরে বিদ্যুৎ দপ্তর সবচেয়ে ব্যর্থ দপ্তরে পরিণত হয়েছে।
আর এই ব্যর্থতার কেন্দ্রে রয়েছেন দপ্তরের মন্ত্রী অভিযোগ, বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে তিনি কথার ফুলঝুড়ি ছড়াতেই বেশি ব্যস্ত। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, যে দপ্তরের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়, সেটিকেই ক্রমশ অকার্যকর করে তোলার নজির তৈরি করেছেন এই মন্ত্রী।
প্রথম মেয়াদে শিক্ষা দপ্তরের অবনতি নিয়ে যেভাবে প্রশ্ন উঠেছিল, এখন একই অভিযোগ উঠছে বিদ্যুৎ দপ্তর নিয়েও। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহিতা নিয়ে। অভিযোগ করা হলেই দায় চাপানো হচ্ছে পূর্বতন বাম সরকারের ঘাড়ে। অথচ আট বছর ক্ষমতায় থাকার পরও যদি একই অজুহাত দেওয়া হয়, তাহলে সরকারের নিজস্ব ব্যর্থতাই সামনে আসে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা সময়মতো প্রকল্প শেষ করা, ট্রান্সমিশন উন্নয়ন ও গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রশাসনিক স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই এই নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে ? কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বৈঠকের পর বৈঠক হলেও মাটির স্তরে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি।
প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে গতি নেই, এমন অভিযোগ নতুন নয়। ত্রিপুরার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং জনজীবনের মান উন্নয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই মৌলিক পরিষেবাই যখন বারবার ভেঙে পড়ছে, তখন উন্নয়নের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই।
এই অবস্থায় শুধুমাত্র উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। নইলে বিদ্যুৎ দপ্তরের এই ব্যর্থতা আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা বৈঠককে গুরুত্ব দিয়েই দপ্তরের আধিকারিকরা প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন কতটা ঘটবে, সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ।