দারিদ্র্য, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের তীব্র আক্রমণ
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৯ জুলাই : ত্রিপুরা রাজ্যে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, লাগামহীন দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পাশাপাশি তিপরা মথা নেতৃত্বাধীন ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি)-এর ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছে ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। বৃহস্পতিবার দলের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী এক দীর্ঘ প্রেস বিবৃতিতে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে দাবি করেন, এগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাজ্যের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও শাসন ব্যবস্থার প্রতিফলন। প্রেস বিবৃতিতে কংগ্রেস দাবি করেছে, দক্ষিণ ত্রিপুরার শান্তিরবাজার মহকুমার রামরাইবাড়ি এডিসি ভিলেজের বলিবারী এলাকার এক চরম দরিদ্র আদিবাসী পরিবার অভাবের তাড়নায় তাদের সদ্যোজাত কন্যাসন্তানকে মাত্র ২১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।
এর কয়েকদিন আগেই কাঞ্চনমালায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আর্থিক সংকটের কারণে এক দরিদ্র পরিবার তাদের শিশুসন্তানকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে দাবি করেছে দল। কংগ্রেসের বক্তব্য, স্বাধীনতার এত বছর পরেও যদি কোনও পরিবার শুধুমাত্র অভাবের কারণে সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হয়, তবে তা রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার চরম অবনতির প্রমাণ। এছাড়াও ছামনু থানার উত্তর লংতরাই এডিসি এলাকার বাসিন্দা নমজি ত্রিপুরার মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেছে কংগ্রেস। দলের দাবি, দীর্ঘদিন রাজ্যে কাজের সন্ধান না পেয়ে ওই যুবক জীবিকার তাগিদে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেন।সেখানে কঠোর পরিশ্রম, অপ্রতুল মজুরি ও পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় এবং গত ৬ জুলাই তাঁর মরদেহ রাজ্যে ফিরে আসে। কংগ্রেসের অভিযোগ, রাজ্যে কর্মসংস্থানের চরম সংকটের কারণেই হাজার হাজার যুবক-যুবতী ভিনরাজ্যে কাজের জন্য যেতে বাধ্য হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণও হারাচ্ছেন। বিবৃতিতে টিটিএএডিসি পরিচালনা নিয়েও একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, আদিবাসী উন্নয়নের পরিবর্তে কাউন্সিল এলাকায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও সম্পদ হস্তান্তরের ঘটনা বেড়েছে। উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, এডিসি এলাকার মূল্যবান জমি ও সম্পদ বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও উত্থাপন করেছে দল।
তাদের বক্তব্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে আদিবাসী এলাকার উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা আরও সংকটের মুখে পড়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রেস বিবৃতিতে কোনও প্রামাণ্য নথি প্রকাশ করা হয়নি।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরব হয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। সম্প্রতি রাজধানী আগরতলায় কর্তব্যরত এক ট্রাফিক পুলিশ আধিকারিককে গাড়ির বনেটে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে দল। পাশাপাশি এক নাবালিকা ধর্ষণ মামলা, রাজ্যে মাদক পাচারের বাড়বাড়ন্ত এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে কংগ্রেসের অভিযোগ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে কটাক্ষ করে কংগ্রেসের দাবি, বাস্তবে অপরাধীরা শাস্তির বদলে প্রশ্রয় পাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রাজ্যের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নে একাধিক দাবি জানিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। দলের পক্ষ থেকে মৃত আদিবাসী যুবকের পরিবার এবং সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলিকে অবিলম্বে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প (রেগা)-এর কাজ পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মদিবস ও মজুরি বৃদ্ধি, সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো, জনকল্যাণমূলক পরিষেবা সম্প্রসারণ এবং দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে কংগ্রেস। প্রেস বিবৃতির শেষে প্রবীর চক্রবর্তী রাজ্যের সাধারণ মানুষকে দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং অপরাধের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।