ইন্দ্রনগরে বৃদ্ধার হার ছিনতাই, পুলিশের জালে নারীসহ অটো গ্যাং,
শহরজুড়ে সক্রিয় ছিনতাই চক্রে আতঙ্ক
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৬ মে : রাজধানী আগরতলার ইন্দ্রনগর এলাকায় এক বয়স্ক মহিলার গলা থেকে সোনার চেইন ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বড়সড় সাফল্য পেল পুলিশ।
এনসিসি থানার পুলিশের জালে ধরা পড়েছে নারীসহ তিন সদস্যের এক সংঘবদ্ধ ‘অটো গ্যাং’। তবে এই গ্রেফতারের মধ্যেই সামনে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র, শহরজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংগঠিত ছিনতাই চক্র।
আজ এক সাংবাদিক সম্মেলনে এনসিসি থানার এসডিপিও সুব্রত বর্মন ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, গত ২৯ এপ্রিল বিকেলে এনসিসি থানাধীন ইন্দ্রনগরের এজি কলোনি এলাকায় হাঁটতে বেরিয়েছিলেন এক বৃদ্ধা। সেই সময় তার নজরে পড়ে দুজন যুবক ও এক তরুণী সন্দেহজনকভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মানবিক কৌতূহল থেকেই তিনি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা ব্যক্তিগত কাজের অজুহাত দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি যে এতটা ভয়ঙ্কর মোড় নেবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি।
কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎই পিছন থেকে এক যুবক এসে তার গলা থেকে সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে পাশেই অপেক্ষারত একটি অটোরিকশায় উঠে চম্পট দেয়। পুরো ঘটনাটি এতটাই দ্রুত ঘটে যে আশপাশের কেউ প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পাননি। তবে সাহসিকতার পরিচয় দেন ওই বৃদ্ধা।
তিনি ছিনতাইকারীদের মুখ মনে রাখেন এবং অটোর নম্বরও লক্ষ্য করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এনসিসি থানায় মামলা রুজু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই তদন্তে নামে পুলিশ। এনসিসি থানার ওসি প্রাজিত মালাকার এবং অভয়নগর আউটপোস্টের ওসি জয়নাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ টিম টানা তল্লাশি চালিয়ে অবশেষে অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
গতকাল রাতে পুলিশ অভিযানে নেমে অটোসহ তিন অভিযুক্ত, বাসু চক্রবর্তী, সুস্মিতা দে এবং অরূপ সাহা কে গ্রেফতার করে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতরা তাদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আগরতলা শহরের একটি গহনার দোকান থেকে ছিনতাই করা সোনার চেইন উদ্ধার করা হয়। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হল, এই অটো গ্যাং দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একই কৌশলে ছিনতাই চালিয়ে আসছিল।
এমনকি গ্রেফতারের দিনও তারা পুনরায় অপরাধ সংগঠিত করার উদ্দেশ্যেই ইন্দ্রনগরে জড়ো হয়েছিল। ঠিক সেই সময় টহলদার পুলিশের নজরে পড়ে যায় তারা। আজ ধৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই চক্রের সাথে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এই একটি ঘটনায় পর্দা উঠেছে আরও বড় এক সমস্যার ওপর। রাজধানী আগরতলায় ইদানিং ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
রামনগর, জয়নগর, ইন্দ্রনগর, বড়জলা, কৃষ্ণনগর, প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একই ধরনের কায়দায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, সংঘবদ্ধ চক্রগুলি এখন অটো, টমটম এবং মোটরবাইক ব্যবহার করে দ্রুত অপারেশন চালাচ্ছে। টার্গেট মূলত একাকী পথচারী, বিশেষ করে মহিলা ও প্রবীণরা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শহরে সিসিটিভি নজরদারি এবং নাকা চেকিং জোরদার থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা বারবার পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
যদিও সাম্প্রতিক গ্রেফতারকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে পুলিশ, তবুও নাগরিক মহলের দাবি, এতে সমস্যার মূল সমাধান হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সংগঠিত অপরাধ দমনে প্রয়োজন আরও গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত পেট্রোলিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা।পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বিষয়ে এসডিপিও বলেন, একা চলাচলের সময় সতর্ক থাকুন, সন্দেহজনক ব্যক্তির গতিবিধি নজরে রাখুন, অপরিচিত কারও সাথে অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন এড়িয়ে চলুন, কোনো সন্দেহজনক ঘটনা দেখলে দ্রুত পুলিশকে খবর দিন।ইন্দ্রনগরের এই ঘটনা শুধু একটি ছিনতাই নয়, বরং শহরের আইনশৃঙ্খলার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।অপরাধীরা যতই কৌশলী হোক, প্রশাসন ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই তাদের রুখে দেওয়া সম্ভব, এখন সেটাই সময়ের দাবি।

