বাংলা জয়ের পর ত্রিপুরা হয়ে দিল্লী পাড়ি সাংসদ বিপ্লবের,
দিলেন মাতাবাড়িতে পুজো, অনুগামীদের উচ্ছাস
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ৫ মে : ত্রিপুরার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কথিত ঐতিহাসিক সাফল্যের পর তাঁর ত্রিপুরা প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক সফর নয়, বরং তা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
মঙ্গলবার আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর-এ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই যে উষ্ণ অভ্যর্থনা তিনি পান, তা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, দলীয় সংগঠনের ভেতরে এবং তৃণমূল স্তরে এখনও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা যথেষ্ট দৃঢ়। ফুলের তোড়া, উত্তরীয় এবং দলীয় পতাকা হাতে কর্মী-সমর্থকদের ভিড়, বিপ্লব দেব জিন্দাবাদ স্লোগানে মুখরিত পরিবেশ, সব মিলিয়ে এটি ছিল শক্তি প্রদর্শনের এক সুস্পষ্ট বার্তা।
বিমানবন্দর থেকে একটি বাইক র্যালি বিপ্লব দেবকে কনভয় করে পৌছায় উত্তর গেট এলাকায়, সেখান সরাসরি ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির-এ গমন এবং সেখানে পূজা অর্চনা করা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীক এবং জনসংযোগের মেলবন্ধন নতুন নয়, তবে বিপ্লব দেবের এই পদক্ষেপ তাঁর সংস্কৃতি-সংলগ্ন রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
রাজ্যের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য প্রার্থনা, এটি যেমন জনমানসে ইতিবাচক বার্তা দেয়, তেমনই এটি তাঁর জননেতা হিসেবে ভাবমূর্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিপ্লব দেব যে মন্তব্যগুলি করেন, তা রাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ।
ভারতীয় জনতা পার্টি-র পশ্চিমবঙ্গের জয়কে তিনি জনগণের জয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং দাবি করেন, এই জয়ের ফলে সে রাজ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা রোধ সম্ভব হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্য সরাসরি আক্রমণ করে তৃণমূল কংগ্রেসকে। তিনি বলেন পশ্চিম বাংলায় একটা জগদ্দল সরকার চলছিল। সেখানে মানুষের কথা বলার অধিকার নেই। মহিলা দের ঘর থেকে বের হওয়ার অধিকার নেই, যুবাদের কর্মসংস্থানের অধিকার নেই।
আইন শৃঙ্খলা বলে কিছুই ছিলো না। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে বর্বর সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার মানুষ এসব থেকে মুক্তি চাইছিলো। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মার্গদর্শনে এবার সেখানে নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কে হতে পারেন ?
এই প্রশ্নের জবাবে বিপ্লব দেব বলেন, এটা সাংগঠনিক বিষয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই বিষয়ে সিদ্ধন্ত নেবেন। বিপ্লব দেব কি ম্যাজিক জানেন যে সবখানেই জয় নিশ্চিত হয়ে যায় ? কোনো ম্যাজিক না, সম্পুর্ন নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করি, দল যে দায়িত্ব দেয় তাকে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পালন করার চেষ্টা থেকেই সফলতা আসে।
নিজেকে “দলের বিশ্বস্ত সৈনিক” হিসেবে তুলে ধরা বিপ্লব দেবের রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ-এর নেতৃত্বেই তিনি কাজ করেন এবং দল আগামী দিনেও যা দায়িত্ব দেবে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন।
এই বক্তব্য একদিকে তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন করে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে বড় দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাকেও খোলা রাখে। এদিন মাতা বাড়িতে পুজো দেওয়ার পর পুনরায় আগরতলা বিমানবন্দরে পৌছান সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব। দিল্লীতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ডাকেই বিকেলে দিল্লী পাড়ি দেন তিনি। সুত্রের খবর পশ্চিম বাংলায় সরকার গঠনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে কে বসছনে কারা কারা কোন কোন মন্ত্রিত্ব পাচ্ছেন তার একটি প্রাথমিক রুপরেখা তৈরি হবে দিল্লীর বৈঠকে। বাংলা থেকেও একাধিক নেতৃত্ব যোগ দেবেন এই বৈঠকে।প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে ত্রিপুরায় দীর্ঘ ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে বিপ্লব দেবের ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক।
সেই সময় তিনি রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকাকালীন দলীয় কোন্দল এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের কারণে তাঁকে মাঝপথে পদত্যাগ করতে হয়, যা অনেকের কাছেই ছিল আকস্মিক। তবে এখানেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা থেমে থাকেনি।
পরবর্তীতে তিনি পশ্চিম ত্রিপুরা লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন এবং সংগঠনিকভাবে হরিয়ানা-র বিজেপি প্রভারী হিসেবে দায়িত্ব পান। সেখানে বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এরপর দিল্লি, ওড়িশা এবং সর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি বিজেপির নির্বাচনী কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। বিপ্লব দেবের প্রত্যাবর্তন ত্রিপুরার রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে। তাঁর সমর্থকদের “বিপ্লব আবার” স্লোগান নিছক আবেগ নয়, বরং তা একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।যদিও তিনি নিজে বারবার বলেছেন, দল যা দায়িত্ব দেবে, সেটাই পালন করবেন, তবুও তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে আবারও রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিপ্লব কুমার দেবের এই সফর শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং তা ভবিষ্যতের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে। তাঁর অতীত সাফল্য, সংগঠনিক দক্ষতা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য, এই তিনের সমন্বয়ে তিনি এখনও বিজেপির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
এখন দেখার বিষয়, ত্রিপুরার রাজনীতিতে “বিপ্লব আবার”স্লোগান কতটা বাস্তবে রূপ পায় এবং তা রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে।

