ভূমিকম্প হলে কেন উলুধ্বনি ও শঙ্খ ধ্বনি দেওয়া হয় ?

4 Min Read

ভূমিকম্পের সময় কেন উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি দেওয়া হয়? — সনাতন ধর্মের প্রাচীন আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান

ভারতীয় উপমহাদেশে ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর আধ্যাত্মিক সতর্কতা হিসেবে দেখা হয়। সনাতন ধর্মে বহু যুগ ধরে ভূমিকম্পের সময় উলুধ্বনি (মহিলাদের জিভের কম্পন থেকে উৎপন্ন উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ) এবং শঙ্খধ্বনি দেওয়ার রীতি প্রচলিত। অনেকেই একে কেবল ধর্মীয় আচার বলে মনে করেন, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে শক্তিতত্ত্ব, তন্ত্রশাস্ত্র এবং শব্দতত্ত্বের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

Contents
ভূমিকম্পের সময় কেন উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি দেওয়া হয়? — সনাতন ধর্মের প্রাচীন আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান⭐ ভূমিকম্প: সনাতন দৃষ্টিতে ‘প্রলয়কারী বায়ু’🔱 উলুধ্বনি: শক্তির আহ্বান ও অশুভ শক্তি নাশ১. উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ২. দুর্গা বা আদিশক্তির আহ্বান৩. মানসিক স্থিতি ও সাহস বৃদ্ধি🕉 শঙ্খধ্বনি: ওঙ্কারের শক্তি ও পরিবেশশুদ্ধি১. ওঙ্কার (ॐ)-এর অনুরণন২. নেগেটিভ শক্তি নিষ্ক্রিয়করণ৩. শারীরিক ও মানসিক উপকার⭐ পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্র কী বলে?⭐ সংক্ষেপে কেন ভূমিকম্পে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি দেওয়া হয়?✔ অশুভ শক্তি ও নেগেটিভ কম্পন নিষ্ক্রিয় করতে✔ দেবী শক্তি ও বিষ্ণুর রক্ষাশক্তি জাগ্রত করতে✔ আতঙ্ক কমিয়ে মানসিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনতে✔ সমাজকে একসঙ্গে সতর্ক ও জাগ্রত করতে✔ শব্দতত্ত্বের মাধ্যমে পরিবেশকে শুদ্ধ করতে

চলুন, বিস্তারিতভাবে দেখি কেন এই দুটি শব্দকে ভূমিকম্পের সময় অত্যন্ত কার্যকর ও পবিত্র প্রতিকার হিসেবে ধরা হয়।


ভূমিকম্প: সনাতন দৃষ্টিতে ‘প্রলয়কারী বায়ু’

পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রে ভূমিকম্পকে বলা হয়েছে—

  • বসুমাতার (পৃথিবীর) কম্পন,

  • প্রলয়কারী বায়ুর বেগ,

  • এবং একটি সময় যখন অশুভ শক্তি ও নেতিবাচক তরঙ্গ সক্রিয় হয়

অতএব, এই অস্থিরতার মোকাবিলায় প্রয়োজন এমন এক শক্তির, যা

  • মানসিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনে,

  • পরিবেশের নেগেটিভ শক্তিকে দূর করে,

  • এবং দেবশক্তির আশ্রয় দেয়।

উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিকে ঠিক এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।


🔱 উলুধ্বনি: শক্তির আহ্বান ও অশুভ শক্তি নাশ

১. উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ

উলুধ্বনি হলো জিভের দ্রুত কম্পনে উৎপন্ন একটি অতিমাত্রায় উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ।
তান্ত্রিক মতে এই শব্দ—

  • চারপাশের নিম্ন-কম্পাঙ্কের নেতিবাচক শক্তিকে ভেঙে দেয়,

  • পরিবেশে দিকশুদ্ধিকারী শক্তি তৈরি করে।

২. দুর্গা বা আদিশক্তির আহ্বান

তন্ত্রশাস্ত্রে উল্লেখ আছে, উলুধ্বনির শব্দ:

  • দেবী শক্তির কম্পন এর সাথে মিল খায়,

  • বিপদ বা প্রলয়ের সময় দেবীর রক্ষাশক্তিকে জাগ্রত করে

এই কারণে দুর্গাপূজা, বিজয়া, বিবাহ থেকে যুদ্ধক্ষেত্র— সব বিশেষ আচারেই উলুধ্বনি প্রচলিত।

৩. মানসিক স্থিতি ও সাহস বৃদ্ধি

ভূমিকম্পে মানুষ ভয় পেয়ে স্থবির হয়ে যায়।
উলুধ্বনি শোনার সাথে সাথে—

  • চারপাশে সতর্কতা ছড়ায়,

  • মানুষ মানসিকভাবে দৃঢ় হয়,

  • সামাজিক ঐক্য ও সমর্থনের শক্তি জন্মায়।

এটি এক প্রকার psychological activation


🕉 শঙ্খধ্বনি: ওঙ্কারের শক্তি ও পরিবেশশুদ্ধি

১. ওঙ্কার (ॐ)-এর অনুরণন

শঙ্খ ফুঁ দিলে যে কম্পন তৈরি হয়—

  • তা ওঙ্কার বা ব্রহ্মনাদ-এর স্বরূপ,

  • যা সৃষ্টির মূল কম্পন এবং শুদ্ধতার প্রতীক।

তাই শঙ্খধ্বনি পরিবেশের অস্থির শক্তিকে শান্ত করে।

২. নেগেটিভ শক্তি নিষ্ক্রিয়করণ

তন্ত্র মতে শঙ্খধ্বনি—

  • নিম্ন-কম্পাঙ্কের অশুভ শক্তিকে ভেঙে ফেলে,

  • ঘর, মাটি ও বাতাসে শুদ্ধিকর তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়,

  • প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আত্মস্থতার শক্তি বৃদ্ধি করে।

৩. শারীরিক ও মানসিক উপকার

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শঙ্খধ্বনি—

  • বায়ুতে অণুর চাপ সমানভাবে ছড়ায়,

  • হৃৎস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে,

  • মস্তিষ্কে শান্তি-সৃষ্টিকারী আলফা তরঙ্গ তৈরি করে।

অতএব এটি শুধু ধর্মীয় নয়, প্রয়োগযোগ্য মানসিক চিকিৎসাও বটে।


পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্র কী বলে?

প্রাচীন শাস্ত্রে নির্দেশ আছে—

“ভূকম্পনে শঙ্খ বাজাও, উলুধ্বনি দাও; দেবী ও বিষ্ণু রক্ষা করবেন।”

এই বিশ্বাস মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে—

  1. দেবশক্তির আহ্বান,

  2. নেগেটিভ শক্তি দূরীকরণ,

  3. মানুষের মনের স্থিরতা ও সাহস বৃদ্ধি

প্রাচীন ঋষি ও তান্ত্রিকরা জানতেন, শব্দের শক্তি বিশাল—
এটি পরিবেশের কম্পন পরিবর্তন করতে পারে,
পৃথিবীর শক্তির সাথে মানবশক্তিকে সুর মিলাতে পারে।


সংক্ষেপে কেন ভূমিকম্পে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি দেওয়া হয়?

✔ অশুভ শক্তি ও নেগেটিভ কম্পন নিষ্ক্রিয় করতে

✔ দেবী শক্তি ও বিষ্ণুর রক্ষাশক্তি জাগ্রত করতে

✔ আতঙ্ক কমিয়ে মানসিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনতে

✔ সমাজকে একসঙ্গে সতর্ক ও জাগ্রত করতে

✔ শব্দতত্ত্বের মাধ্যমে পরিবেশকে শুদ্ধ করতে

এটি শুধুই রীতি নয়—
এটি আধ্যাত্মিক শক্তি, তন্ত্রজ্ঞান ও শব্দবিজ্ঞানের এক প্রাচীন বিজ্ঞানসম্মত প্রতিকার।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version