নির্বাচনোত্তর হিংসা, ঘরছাড়া কর্মী ও রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, ভগৎ সিং যুব আবাসে ক্ষোভের মুখে প্রদেশ সভাপতি
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২০ এপ্রিল : নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাসের অভিযোগে ঘরছাড়া বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে অবশেষে আগরতলার ভগৎ সিং যুব আবাসে পৌঁছালেন প্রদেশ বিজেপি সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য। সেখানে আশ্রয় নেওয়া কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিপরা মথা সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলার জেরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু বিজেপি কর্মী নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে এখানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে এই সফর ঘিরেই তৈরি হয় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। আশ্রিত কর্মীদের একাংশ ক্ষোভ উগরে দেন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার পরও শীর্ষ নেতৃত্বের দেরিতে উপস্থিতি তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কিছু উত্তেজিত ব্যক্তি সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন, ফলে সাময়িক অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। এদিন রাজীব ভট্টাচার্যের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা বিধানসভার সরকার পক্ষের মুখ্য সচেতক কল্যাণী সাহা রায়, বিজেপি সাধারণ সম্পাদক বিপিন দেববর্মা সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। প্রতিনিধিদল আশ্রিতদের সঙ্গে কথা বলে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজীব ভট্টাচার্য হিংসার তীব্র নিন্দা করেন এবং তিপরা মথার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তাঁর অভিযোগ, ঐক্যের কথা বললেও বাস্তবে তাদের সমর্থকরাই জনজাতি সমাজের মানুষের উপর হামলা চালাচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, ভয়ভীতির পরিবেশে শতাধিক বিজেপি কর্মী ঘরছাড়া হয়েছেন।প্রশাসনের ভূমিকাও তুলে ধরে তিনি জানান, সিআরপিএফ ও পুলিশ বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে এবং ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক মহলে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। একদিকে বিজেপি নেতৃত্ব তিপরা মথার বিরুদ্ধে সরব, অন্যদিকে সেই একই দলের সঙ্গে জোটে সরকার পরিচালনার বাস্তবতা, এই দ্বৈত অবস্থান নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
বিরোধীদের দাবি, নির্বাচনের আগে বড় বড় প্রতিশ্রুতি ও হুঙ্কার শোনা গেলেও বাস্তবে নিজেদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়েছে শাসক দল। ক্ষোভের আরও একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নেতৃত্বের বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া। ১২ এপ্রিল এডিসি নির্বাচন এবং ১৭ এপ্রিল ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই আক্রান্ত কর্মীরা আশ্রয় নিয়েছেন আগরতলায়। অথচ প্রদেশ সভাপতির এই সফর হতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ দিন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে এদিনের উত্তেজনায়। আশ্রিত কর্মীদের অভিযোগ, তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের কথায়, রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। অন্যদিকে আক্রান্ত কর্মী সমর্থকদের একাধিক প্রশ্ন এখন শির্ষ নেতৃত্বদের মাথা ব্যাথার কারন হয়ে দাড়িয়েছে।
তিপরা মথার বিরুদ্ধে বিজেপি নেতৃত্বের তীব্র ভাষার আক্রমণ নতুন নয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। যে দলকে প্রকাশ্যে দোষারোপ করা হচ্ছে, সেই দলের সঙ্গেই জোটে সরকার পরিচালনা করছে বিজেপি। ফলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক,এই সমালোচনা কি শুধুই রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তবে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছাই নেই? জোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতা কি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। যখন রাজ্যের একাংশে দলীয় কর্মীরা ঘরছাড়া, আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত, এই ছবি কি প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার অভাবকেই সামনে আনছে না? পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবর্তে দূর থেকে নজরদারি কি যথেষ্ট ?সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পুলিশ প্রশাসন।
অভিযোগ, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধরের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি।যদিও কিছু গ্রেফতারের কথা বলা হচ্ছে, তবুও আক্রান্তদের বক্তব্য, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। এই নীরবতা কি অক্ষমতা, নাকি রাজনৈতিক চাপের ফল, তা নিয়েই জোর জল্পনা। ভগৎ সিং যুব আবাসে এদিনের উত্তেজনা সেই জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। নেতৃত্বের প্রতি হতাশা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটে। এটি শুধু আইন শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং দলীয় ভিতরে জমে থাকা অসন্তোষেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল সঙ্কটটি দ্বিমুখী। একদিকে, জোটসঙ্গীকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে অনীহা, অন্যদিকে, নিজেদের সংগঠনের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সাধারণ কর্মীরা হয়ে উঠছেন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। নির্বাচনের আগে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি সেই দাবিগুলিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
শাসক দলের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তবে কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় সেটাই। সব মিলিয়ে, ত্রিপুরার বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ক্ষমতায় থাকা মানেই নিয়ন্ত্রণে থাকা নয়। বরং, জোট রাজনীতির সমীকরণ, প্রশাসনিক নীরবতা এবং নেতৃত্বের অগ্রাধিকার, এই তিনের সংঘাতে তৈরি হয়েছে এক জটিল সংকট, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের জীবনে। এখন নজর, এই প্রশ্নগুলির জবাব আদৌ আসে কি না, নাকি রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় পুরো বিষয়টি।

