বিশালগড়ে গুলি-কাণ্ডে নাটকীয় মোড়, আদালত চত্বরে ‘নাটক’, গ্রেফতার মূল অভিযুক্ত রণবীর দেবনাথ
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২৭ এপ্রিল : ত্রিপুরার বিশালগড়ে বহুল আলোচিত গুলি-কাণ্ডে সোমবার এক নাটকীয় মোড় নিল পরিস্থিতি। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর হঠাৎ করেই বিশালগড় আদালত চত্বরে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করলেন মূল অভিযুক্ত রণবীর দেবনাথ। তবে আত্মসমর্পণের এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক, উঠেছে পুলিশের ভূমিকা ও রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, রণবীর দেবনাথ এদিন অস্বাভাবিক আচরণ করে অর্ধনগ্ন অবস্থায় আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন এবং সেখানেই ধর্নায় বসে পড়েন। আচমকা এই ঘটনায় আদালত চত্বরে উপস্থিত সাধারণ মানুষ, আইনজীবী ও কর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিরাপত্তারক্ষীরা হস্তক্ষেপ করেন। পরে রণবীর নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বলে জানা যায়।পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করে এবং গুলি চালনার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশালগড় জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, একজন পলাতক অভিযুক্ত কীভাবে এত সহজে আদালত চত্বরে প্রবেশ করে এমন ‘নাটকীয়’ কাণ্ড ঘটাতে পারলেন?নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই ফাঁকফোকর প্রশাসনের ব্যর্থতাকেই সামনে এনে দিচ্ছে বলে মত অনেকের। উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগেই বিশালগড়ে এক ঠিকেদারের বাড়িতে দুঃসাহসিক গুলি চালনার ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ, ওই ঠিকেদারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছিল এবং তা না মানলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে হুমকি দিতে দেখা যায় রণবীর দেবনাথকে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি অফিস টিলায় একটি গাড়ি থেকে ধারালো অস্ত্র ও তাজা কার্তুজ উদ্ধার হওয়ায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার জেরে মোট ১৮ জনের নামে মামলা দায়ের হলেও এখনও পর্যন্ত মাত্র ৩ জন মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তা নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক। অনেকেই মনে করছেন, এত বড় ঘটনার পরেও পুলিশের এই সীমিত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এরই মধ্যে রণবীর দেবনাথের আজকের পাগল সাজার নাটক নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে আরও দুই সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে তার রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে। স্থানীয় মহলে জোর গুঞ্জন, শাসকদলীয় কিছু মন্ত্রী ও স্থানীয় বিধায়কদের সঙ্গে রণবীরের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সেই কারণেই কি পুলিশের নমনীয়তা, এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
আরও বিস্ময়ের বিষয়, গ্রেপ্তারের পর থানায় নিয়ে যাওয়ার পর রণবীরকে হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে ছবি তুলতে দেখা গেছে। এই দৃশ্য অনেকের কাছেই আইন-শৃঙ্খলার প্রতি চরম উপহাস বলে মনে হয়েছে। অভিযোগ উঠছে, পুলিশও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করছে, অথচ মূল সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট কঠোরতা দেখানো হচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের একাংশ সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, রাজ্যে আদৌ কি আইনের শাসন রয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের শীর্ষ কর্তারা যে সুশাসন-এর দাবি করেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন কোথায় ? বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পলাতক অভিযুক্তের এই ধরনের প্রকাশ্য ‘বাহুবলি’ আচরণ শুধু আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতাই নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতারও স্পষ্ট ইঙ্গিত।
দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে জনমনে আস্থা আরও কমে যেতে পারে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, রণবীর দেবনাথের উদ্দেশ্য কী ছিল, তার এই আচরণের পেছনে অন্য কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কিনা এবং এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন একটাই, এই আশ্বাসে কি জনসাধারণের আস্থা ফিরবে, নাকি বিশালগড়ের এই ঘটনা রাজ্যের আইন শৃঙ্খলার দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলবে ? সময়ই দেবে তার উত্তর।



