সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির অভিযোগে চাঞ্চল্য, তদন্তের দাবিতে সরব সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২৭ এপ্রিল : পশ্চিম জেলার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ সামনে আসতেই জেলাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।অফিসে কর্মরত দুই কর্মী, ভূপেশ গুপ্তা ও পিনাক দেব এর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি দলিল ডেলিভারির নামে তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছেন, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়মবহির্ভূত। শহরবাসীর দাবি, এই অর্থ কোনো সরকারি রসিদ ছাড়াই সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হচ্ছে।
ফলে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি ডিড রাইটার ও আইনজীবীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনায় অফিসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মূলত সম্পত্তি সংক্রান্ত নথিপত্র নিবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর। এখানে জমি-বাড়ির দলিল রেজিস্ট্রি, বিক্রয় চুক্তি, দানপত্র, লিজ ডিড, মর্টগেজ সহ বিভিন্ন আইনি নথি নথিভুক্ত করা হয়।দলিল রেজিস্ট্রেশন না হলে কোনো সম্পত্তির মালিকানা আইনি স্বীকৃতি পায় না। তাই জমি বা বাড়ি কেনাবেচার ক্ষেত্রে এই অফিসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্চা (Record of Rights) বা জমির খতিয়ান সংক্রান্ত কাজেও এই দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় থাকে, যা জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অপরিহার্য।সাব-রেজিস্ট্রার একজন গেজেটেড অফিসার, যিনি রাজ্য সরকারের অধীনস্থ রেজিস্ট্রেশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।সাধারণত সিভিল সার্ভিস বা রাজ্য প্রশাসনিক পরিষেবার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।সাব রেজিস্ট্রার একজন, আইন ও ভূমি সংক্রান্ত জ্ঞান প্রশাসনিক দক্ষতা, নথিপত্র যাচাই ও আইনি বৈধতা নির্ধারণের ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাক্তি। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার দায়িত্ব সড়াসরি বর্তায় তার কাধে।
এমন একটি গুরুত্ব সরকারি দপ্তরে যদি মানুষ গিয়ে পরিষেবার বসলে প্রনামী গুজে দিতে হয় তবে এর জবাব দিহিতা কে করবে? সাধারনঅত মানুষ, জমি বা বাড়ির দলিল রেজিস্ট্রি করতে, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের নথি বৈধ করতে, দানপত্র, উইল বা লিজ রেজিস্ট্রেশন, সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত আইনি প্রমাণ সংগ্রহ, ব্যাংক লোনের জন্য মর্টগেজ ডিড নিবন্ধন এই সমস্ত কাজের জনে এখানে যান। যে অভিযোগ পাওয়া গেছে তাতে শুধুমাত্র জমির দলিল হাতে পেতেই মানুষকে দিতে হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ হাজার, তাহলে সহনেই অনুমেয় আরও বাকী অন্যান্য জটিল কাজের ক্ষেত্রে দক্ষিনার পরিমান কতো হতে পারে।
অভিযুক্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রমাণিত হলে একাধিক আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, অবৈধ অর্থ গ্রহণ, সরকারি কর্মচারী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার ঘুষ নেওয়া ও বেআইনি আর্থিক লেনদেন, এসব ধরনের অপরাধে চাকরি থেকে বরখাস্ত, ফৌজদারি মামলা এবং কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এই ঘটনায় সদর সাব-রেজিস্ট্রারের ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা প্রশাসনিক নজরদারির অভাবকেই নির্দেশ করে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এই ধরনের দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা নষ্ট করার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষ যখন সরকারি দপ্তরে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন, তখন তারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। মহকুমাবাসীদের বক্তব্য, যদি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই প্রবণতা আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে ভরসা হারাবে। এদিকে, ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ জেলা শাসকের হস্তক্ষেপ দাবি করে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সবমিলিয়ে, সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এই ঘটনায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন দেখার, প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।



