পুনর্বাসনের দাবিকে সামনে রেখে রাজ্য অচলের ডাক, ১২ জুন থেকে ৭২ ঘন্টা ধর্মঘটের ডাক এনএলএফটি, এটিটিএফ-এর
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা : ত্রিপুরায় আত্মসমর্পণকারী প্রাক্তন জঙ্গিদের সংগঠনগুলির আন্দোলন ঘিরে ফের উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি আত্মসমর্পণকারী বৈরীদের সংগঠন গেরিলা প্রত্যাবর্তিত দাবি কমিটি (GRDC) গত ৫ জুন জাতীয় সড়ক ও রেল অবরোধের ডাক দিয়েছিল। পরে রাজ্যের জনজাতি কল্যাণমন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা-র সঙ্গে বৈঠকের পর সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আবার আত্মসমর্পণকারী প্রাক্তন জঙ্গিদের অন্য দুটি সংগঠন ১২ জুন থেকে ৭২ ঘণ্টার ত্রিপুরা বন্ধ ও অবরোধ কর্মসূচির হুমকি দিয়েছে বলে খবর।
পুনর্বাসন সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে ১২ জুন থেকে ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক দিল আত্মসমর্পণকারী বৈরী সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা।সোমবার আগরতলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আত্মসমর্পণকারী এনএলএফটি (NLFT)-র সভাপতি প্রসেনজিৎ দেববর্মা, এটিটিএফ (ATTF)-এর সভাপতি কলেন্দ্র দেববর্মা, এটিটিএফ-এর নেতা পরিমল দেববর্মা-সহ সংগঠনের অন্যান্য প্রতিনিধিরা।
তাঁদের অভিযোগ, আত্মসমর্পণের সময় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অধিকাংশই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বহু প্রাক্তন বৈরী ও তাঁদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।সংগঠনের নেতারা দাবি করেন, বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন স্তরে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তাঁরা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান।প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগেই আত্মসমর্পণকারী বৈরীদের আরেক সংগঠন গেরিলা প্রত্যাবর্তিত দাবি কমিটি (GRDC) পুনর্বাসনসহ একাধিক দাবিতে জাতীয় সড়ক ও রেল অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। পরে রাজ্যের জনজাতি কল্যাণমন্ত্রী বিকাশ দেববর্মার সঙ্গে বৈঠকের পর সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু তার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের আত্মসমর্পণকারী বৈরীদের দুই বৃহৎ সংগঠনের পক্ষ থেকে ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শান্তির স্বার্থে তাঁরা অস্ত্র ছেড়ে মূল স্রোতে ফিরে এসেছিলেন।
কিন্তু পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। সরকারের কাছে অবিলম্বে দাবিগুলি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, উপযুক্ত পদক্ষেপ না হলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। এদিকে, বারবার ধর্মঘট, জাতীয় সড়ক অবরোধ ও রেল অবরোধের হুমকিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ত্রিপুরার জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত জাতীয় সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ওপর।
রাজ্যের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আসলে কী চলছে? দু’দিন পরপর জাতীয় সড়ক অবরোধ, রেল অবরোধ কিংবা বন্ধের হুমকি দিয়ে কি পুনর্বাসনের দাবি আদায়ের চেষ্টা চলছে, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনও চাপ তৈরির রাজনীতি কাজ করছে? ত্রিপুরার মানুষ এখনও ভুলে যাননি সেই অশান্ত সময়ের কথা, যখন সন্ত্রাস, অপহরণ, খুন এবং চাঁদাবাজিতে জর্জরিত ছিল পাহাড় ও সমতল। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের হাতে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ গিয়েছে। বহু পরিবার আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে।
সেই প্রেক্ষাপটে যাঁরা একসময় অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, তাঁরাই আবার রাজ্যের জনজীবন অচল করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, এমন অভিযোগ এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। পুনর্বাসনের দাবি যে অযৌক্তিক, তা বলা যাবে না। আত্মসমর্পণের সময় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা, বাসস্থান ও সামাজিক পুনর্বাসনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যদি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়ে থাকে, তবে সরকারের উচিত দ্রুত সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়ার নামে বারবার জাতীয় সড়ক ও রেলপথ অবরোধের হুমকি কি গ্রহণযোগ্য ?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, সরকার দীর্ঘদিন ধরে জনজাতি ভোটব্যাঙ্ককে সামনে রেখে এক ধরনের ‘তোষণ নীতি’ অনুসরণ করছে। ফলে আত্মসমর্পণকারী সংগঠনগুলিও বুঝে গিয়েছে যে চাপ সৃষ্টি করলে সরকার আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে। এর ফলেই একের পর এক আন্দোলনের ডাক, অবরোধের হুমকি এবং প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। জাতীয় সড়ক ও রেলপথ ত্রিপুরার জীবনরেখা।
এই দুই যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, রোগী, ছাত্রছাত্রী এবং দৈনন্দিন যাত্রীরা। পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামও বাড়তে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে পুনর্বাসনের অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রিতা, এই দুইয়ের ফাঁকেই তৈরি হচ্ছে অসন্তোষের ক্ষেত্র। কিন্তু সেই অসন্তোষকে পুঁজি করে যদি বারবার রাজ্য অচল করার হুমকি দেওয়া হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমা অতিক্রম করে জনস্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, ১২ জুন ঘোষিত ৭২ ঘণ্টার কর্মসূচির আগেই রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার কোনও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে কিনা। কারণ ত্রিপুরার মানুষ আর কোনওভাবেই অস্থিরতার অতীত অধ্যায়ে ফিরে যেতে চান না। শান্তি, উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতার পরিবেশ বজায় রাখাই আজ রাজ্যের সর্ববৃহৎ প্রয়োজন।