Home » Blog » সাব্রুম-বিলোনিয়া সীমান্তে অনুপ্রবেশ

সাব্রুম-বিলোনিয়া সীমান্তে অনুপ্রবেশ

অনুপ্রবেশ ও হুন্ডি চক্রে আতঙ্ক: দক্ষিণ ত্রিপুরা সীমান্তে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

by Planet Tripura
0 comments 9 views

দক্ষিণ ত্রিপুরা সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের রমরমা: বিপন্ন জাতীয় নিরাপত্তা, ক্ষুব্ধ সীমান্তবাসী

প্রতিনিধি, দক্ষিণ ত্রিপুরা: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কাঁটাতারের বেড়া থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ ত্রিপুরায় থামছে না অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান। সাম্প্রতিক সময়ে সাব্রুম থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুপ্রবেশকারী ও সমাজবিরোধীদের অবাধ যাতায়াত জনমনে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত সুরক্ষায় দৃশ্যমান গাফিলতি দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৪ জুন সাব্রুমের বৈষ্ণবপুর এলাকা দিয়ে তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে। স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় তারা দক্ষিণ ত্রিপুরার কলসি এলাকায় এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেয় এবং পরে কৌশলে আত্মগোপন করে।



এর ঠিক তিন দিন পর, ১৭ জুন ১২১ নম্বর ব্যাটালিয়নের বিএসএফ জওয়ানরা মনুঘাট এলাকা থেকে ইমন মল্ল ও নেপাল দাস নামে দুই সন্দেহভাজনকে আটক করে। ধৃত ইমন মল্লের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি কারেন্সি ব্যবহার করে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা ও পাচার বাণিজ্যের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, নেপাল দাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে লোক এনে এ দেশে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।

এরই মধ্যে বিলোনিয়া সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করে দুই বাংলাদেশি যুবক সরাসরি পৌঁছে যায় সাব্রুম রেল স্টেশনে। সেখানে কর্মরত বিএসএফ এবং জিআরপি (GRP) যৌথ অভিযানে রিফাত হাসান ও তারেক হোসেন নামে দুই যুবককে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা শ্রীমন্তপুর এলাকার ‘জামিয়া আজিজিয়া মাদ্রাসা’-র শিক্ষার্থী। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ধৃত রিফাত হাসানের মা বাংলাদেশের একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। ধৃতদের বাবা-মায়ের পরিচয় সংক্রান্ত রহস্যময় ও অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্যে বড় ধরনের কোনো অন্তর্ঘাতমূলক ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছে প্রশাসন। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করে গত ২২ জুন আদালতে সোপর্দ করেছে।

সীমান্তের এই অরাজকতার মধ্যেই ওপাড়ে গিয়ে ধরা পড়েছে আরেক ভারতীয় চোরাকারবারি। মনুঘাটের রমেন্দ্রনগর এলাকার বাসিন্দা বাদল মল্লের ছেলে বাপন মল্ল ওরফে টুটন দীর্ঘদিন ধরে মাদক, মোটরসাইকেলের পার্টস এবং গো-তস্করির (গোরু পাচার) সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ থেকে চোরাই পথে বিপুল পরিমাণ রাবার ভারতে নিয়ে আসারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওপাড়ে বাংলাদেশের আন্ধার মানিক এলাকার সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সাথে তার সরাসরি ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ ছিল। সম্প্রতি বাপন অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে ওখানকার সাধারণ জনগণ তাকে হাতেনাতে ধরে বিজিবির (BGB) ৪৩ নম্বর ব্যাটালিয়নের হাতে তুলে দেয়। পরে তাকে ভূজপুর থানা পুলিশের মাধ্যমে আদালতে প্রেরণ করা হয়।



অনুপ্রবেশের এই বন্যা কেন? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সেই ক্ষতিগ্রস্ত বেড়া মেরামতের কোনো দৃশ্যমান বা স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সীমান্ত জুড়ে তৈরি হওয়া এই ‘ছিদ্রপথ’ বা গ্যাপগুলোকেই এখন অনুপ্রবেশকারী এবং চোরাচালানিরা তাদের নিরাপদ করিডোর বা স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়া যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন অকেজো প্রায়, যা ভারতবিরোধী শক্তিকে পরোক্ষ সুবিধা করে দিচ্ছে বলে মনে করছে স্থানীয় ওয়াকিবহাল মহল।

দক্ষিণ ত্রিপুরায় বাংলাদেশি টাকার রমরমা বাণিজ্য এবং চোরাচালানের এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে ‘ফান্ডিং’ বা অর্থ জোগানের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, উত্তর-পূর্ব ভারতের এই সীমান্তকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে অনুপ্রবেশকারীরা সহজেই পাঞ্জাব বা বিহারের মতো রাজ্যে পৌঁছে যাচ্ছে এবং সেখানকার দেশবিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়ে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষছে।

বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি এবং জরুরি পদক্ষেপ: দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় এবং এই বিপজ্জনক অনুপ্রবেশ রুখতে বিশেষজ্ঞ মহল ও সীমান্তবাসী অবিলম্বে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন:

  • ড্রোন ও নাইট-ভিশন নজরদারি: সীমান্তের সংবেদনশীল শহর এবং গ্রামগুলোতে অবিলম্বে ড্রোন সার্ভিলেন্স এবং উন্নত নাইট-ভিশন ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

  • যৌথ গোয়েন্দা তৎপরতা: বিএসএফ, রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও সমন্বয়ভিত্তিক করতে হবে।

  • কঠোর শাস্তি: অনুপ্রবেশকারী এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় দালাল বা জনপ্রতিনিধিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সীমান্তবর্তী এলাকার সচেতন জনগণের স্পষ্ট দাবি—কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের ‘কুম্ভকর্ণের ঘুম’ ভেঙে দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করুক এবং অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁটাতারের বেড়া সংস্কার করা হোক। অন্যথায়, দক্ষিণ ত্রিপুরার এই সীমান্ত আগামী দিনে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক অপূরণীয় বিপদ ডেকে আনবে। বর্তমান এই নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং অনুপ্রবেশকারীদের সমূলে চিহ্নিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দক্ষিণ জেলা।

You may also like

Leave a Comment