সামার্থ পোর্টালে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু, নতুন স্বপ্নে কলেজমুখী ছাত্রছাত্রীরা
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২৯ মে : ত্রিপুরার সরকারি কলেজগুলিতে শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া। প্রতি বছরের মতো এবারও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা ভবিষ্যতের নতুন স্বপ্ন নিয়ে কলেজমুখী।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে ভর্তি ব্যবস্থার ধরনও। লম্বা লাইন, ফর্ম সংগ্রহের ভিড় কিংবা এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে ছুটে বেড়ানোর দিন এখন অনেকটাই অতীত।ডিজিটাল ব্যবস্থার হাত ধরে এবারও সম্পূর্ণ অনলাইনে শুরু হয়েছে স্নাতক স্তরের ভর্তি প্রক্রিয়া।
উচ্চশিক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের ২৯টি সরকারি ডিগ্রি কলেজে ভর্তি নেওয়া হবে সামার্থ পোর্টালের মাধ্যমে। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া চলবে আগামী ৭ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত।
শিক্ষার্থীরা এখন ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে আবেদন করতে পারছেন। অনেকেই আবার বিভিন্ন সাইবার ক্যাফে ও কমন সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে ভর্তি ফর্ম পূরণ করছেন। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র এখন কলেজে ভর্তি নিয়ে উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।
রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা। কেউ তথ্য জানতে কলেজে আসছেন, কেউ আবার নতুন কোর্স সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। ভর্তি সংক্রান্ত সহায়তার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার কলেজগুলির গ্রীষ্মকালীন ছুটিও বাতিল করেছে, যাতে ভর্তি প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায় এবং শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। উচ্চশিক্ষা অধিকর্তা অনিমেষ দেববর্মা জানিয়েছেন, স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং সহজলভ্য ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে।
অফলাইন আবেদন গ্রহণ করা হবে না বলেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে। তাঁর মতে, ডিজিটাল পদ্ধতির ফলে ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সময় ও খরচও কমছে ছাত্রছাত্রীদের। এবারের ভর্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল সিপাহিজলা জেলার নলছড়ে নতুন সরকারি মহিলা ডিগ্রি কলেজের সূচনা।
দীর্ঘদিন ধরেই ওই অঞ্চলে একটি মহিলা কলেজের দাবি ছিল। নতুন এই কলেজ চালু হওয়ায় বহু ছাত্রী এবার বাড়ির কাছেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছাত্রীরা এর ফলে অনেক বেশি উপকৃত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছে শিক্ষা মহল। জাতীয় শিক্ষানীতি বা এনইপি ২০২০-এর আলোকে রাজ্যের উচ্চশিক্ষায় আরও নতুনত্ব আনার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। আইএএসই, কুঞ্জবনে নতুন বিএসসি কম্পিউটার সায়েন্স কোর্স চালু করা হচ্ছে, যেখানে থাকবে ৩০টি আসন।প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার চাহিদা বাড়তে থাকায় এই কোর্সকে ঘিরেও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পাশাপাশি বিএ ইংরেজি মেজর কোর্সের আসনসংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। ফলে মানবিক বিভাগেও পড়াশোনার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। শুধু সাধারণ ডিগ্রি কলেজ নয়, রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পেশাদারী কোর্সের ভর্তিও এখন পুরোদমে চলছে।ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং, ফার্মেসি, প্যারামেডিক্যাল, আইটি এবং ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত কোর্সগুলির প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। ছাত্রছাত্রীরা এখন শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকেও নজর দিচ্ছেন।
এদিকে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ত্রিপুরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা টিআইটি-কে ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং আগরতলার উইমেন্স কলেজকে ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তরের জন্য ইতিমধ্যেই গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। এই দুই প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
বিশেষ করে প্রযুক্তি শিক্ষা ও নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে ত্রিপুরা আরও এগিয়ে যাবে বলেই আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে সরকারি ডিগ্রি কলেজগুলিতে মোট আসনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৫৯।
নতুন কলেজ ও নতুন কোর্স চালুর ফলে ২০৫টি আসন বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সম্ভাব্য সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার ৯৬৭। ফলে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর জন্য পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা রয়েছে বলেই দাবি দপ্তরের।
ভর্তি মরশুমকে ঘিরে এখন রাজ্যের কলেজ চত্বরগুলিতে এক অন্যরকম আবহ। নতুন কলেজে ভর্তি হওয়ার আনন্দ, নতুন বন্ধু পাওয়ার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা, সব মিলিয়ে ছাত্রছাত্রীদের চোখেমুখে স্পষ্ট উচ্ছ্বাস। কেউ ডাক্তার হতে চান, কেউ শিক্ষক, কেউ আবার প্রযুক্তির জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করতে চান।
সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ হিসেবেই এখন কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে ব্যস্ত রাজ্যের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। ত্রিপুরার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর, নতুন কলেজ, নতুন কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ, সব মিলিয়ে রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামো যে ধীরে ধীরে আরও আধুনিক ও বিস্তৃত হচ্ছে, তা স্পষ্ট। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা।