Home » Blog » জটিল অস্ত্রোপচারে নবজাতকের প্রাণ বাঁচালেন ডা. অনিরুদ্ধ বসাক

জটিল অস্ত্রোপচারে নবজাতকের প্রাণ বাঁচালেন ডা. অনিরুদ্ধ বসাক

দুই দিনের নবজাতককে নতুন জীবন দিল টিএমসির সফল অস্ত্রোপচার

by Planet Tripura
0 comments 3 views

দুই দিনের নবজাতকের জীবন বাঁচাল ডা: অনিরুদ্ধ বসাক, সফল জটিল অস্ত্রোপচারে নতুন আশার আলো

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২৯ মে : মাত্র দুই দিন বয়সী এক নবজাতকের অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করে নজির গড়ল হাঁপানিয়ার ত্রিপুরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পিডিয়াট্রিক্স সার্জন ডা: অনিরুদ্ধ বসাক। চিকিৎসকদের তৎপরতা, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং একদল দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর নিরলস প্রচেষ্টায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে শিশুটি।

বর্তমানে সে সম্পূর্ণ সুস্থ, মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে এবং স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। শিশুটির বাড়ি তেলিয়ামুড়ার করইলং এলাকায়। শিশুটির মা বিথি রায়ের গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে সোনোগ্রাফি পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে গর্ভস্থ শিশুর একটি মারাত্মক জন্মগত সমস্যা রয়েছে।

দেখা যায়, শিশুটির পেটের খাদ্যনালী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রসহ একাধিক অঙ্গ বুকের বাঁ দিকের অংশে উঠে গিয়ে ফুসফুসের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই জটিল রোগের নাম কনজেনিটাল ডায়াফ্রাম্যাটিক হার্নিয়া (Congenital Diaphragmatic Hernia বা CDH)। এই রোগে শিশুর ডায়াফ্রামে জন্মগতভাবে ছিদ্র বা দুর্বলতা থাকে।

ডায়াফ্রাম হলো বুক ও পেটের মাঝখানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশি, যা শ্বাস-প্রশ্বাসে বড় ভূমিকা পালন করে। সেই অংশে ছিদ্র থাকলে পেটের অঙ্গগুলো বুকের ভেতরে উঠে আসে এবং ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শিশুর জন্মের পর গুরুতর শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বহু ক্ষেত্রে নবজাতকের জীবনহানির আশঙ্কাও থাকে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, গর্ভকালীন পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেয়ে তারা যোগাযোগ করেন টিএমসির বিশিষ্ট পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা: অনিরুদ্ধ বসাকের সঙ্গে।

সমস্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখে তিনি পরিবারকে আগাম সতর্ক করে জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক এবং জন্মের পর দ্রুত অস্ত্রোপচার ছাড়া বাঁচানো সম্ভব হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৯ মে জিবি হাসপাতালে শিশুটির জন্ম হয়।

জন্মের পরপরই নবজাতককে জরুরি ভিত্তিতে ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে ডা. অনিরুদ্ধ বসাকের নেতৃত্বে চিকিৎসক, অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ, নার্স ও পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার টিম দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি শুরু করেন।

২০ মে সম্পন্ন হয় বহু ঘণ্টাব্যাপী জটিল অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকদের ভাষায়, এটি ছিল ফিফটি-ফিফটি চান্স-এর লড়াই। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির বুকের ভিতরে উঠে যাওয়া অন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ পুনরায় পেটের নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করা হয় এবং ডায়াফ্রামের ত্রুটিপূর্ণ অংশ মেরামত করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর কয়েকদিন শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ধীরে ধীরে তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে। বর্তমানে শিশুটি সুস্থ রয়েছে এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

এই সাফল্যের পেছনে হাসপাতালের সমগ্র মেডিক্যাল টিমের অবদানের কথা উল্লেখ করে ডা: অনিরুদ্ধ বসাক বলেন, নবজাতকের এই ধরনের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সময়মতো রোগ নির্ণয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং দক্ষ পোস্ট-অপারেটিভ পরিচর্যাই শিশুটিকে নতুন জীবন দিয়েছে।

তিনি আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থায় উন্নত সোনোগ্রাফির মাধ্যমে এই রোগ ধরা পড়ে, ফলে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়। শিশুটির মা-বাবা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ডা: বসাক ও গোটা চিকিৎসক দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদের কথায়, আমরা প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।

কিন্তু ডাক্তারবাবুর আত্মবিশ্বাস আর চিকিৎসাতেই আজ আমাদের সন্তান নতুন জীবন পেল। রাজ্যের চিকিৎসা মহলেও এই সফল অস্ত্রোপচারকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নবজাতকের এমন জটিল সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া চিকিৎসা পরিকাঠামোর অগ্রগতিরই প্রমাণ।

বহু বছর ধরেই ডা: অনিরুদ্ধ বসাক শিশুদের জটিল অস্ত্রোপচারে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এর আগেও একাধিক কঠিন ও বিরল অস্ত্রোপচারে সাফল্য এনে বহু শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছেন তিনি।

এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর জীবনরক্ষার গল্প নয়, বরং ত্রিপুরার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা, চিকিৎসকদের নিষ্ঠা এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইল।

You may also like

Leave a Comment