বকেয়া বেতন, গ্র্যাচুইটি, নিয়মিতকরণ ও সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী-সহায়িকাদের
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২৮ মে : রাজ্যের শিশু, গর্ভবতী মা এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা।শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে অপুষ্টি রোধ, টিকাকরণ সচেতনতা, গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, কিশোরী স্বাস্থ্য, পরিবার পর্যায়ে পুষ্টি সংক্রান্ত সচেতনতা, সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই বছরের পর বছর কাজ করে চলেছেন তাঁরা। অথচ সেই কর্মী-সহায়িকারাই আজ নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ তুললেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাবি পূরণ না হওয়া, বেতন-ভাতা অনিয়মিত থাকা, অবসরকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চনা এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকর না করার অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার আগরতলার স্টুডেন্ট হেলথ হোমে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিল ত্রিপুরা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা সমিতি। সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা থেকে আগামী দিনে রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখাও তৈরি করা হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদিকা কল্পনা কলই জানান, রাজ্যের প্রায় ২০ হাজার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। অভিযোগ, গত দু’মাস ধরে কর্মী ও সহায়িকারা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাননি।
অত্যন্ত সামান্য সম্মানীভিত্তিক ভাতায় কাজ করা এই কর্মীদের কাছে মাসিক ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে পরিবার চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়া। সংগঠনের বক্তব্য, একদিকে দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া বৃদ্ধি, অন্যদিকে অনিয়মিত ভাতা, এই পরিস্থিতিতে বহু কর্মী-সহায়িকার সংসার কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে। তাই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সমস্ত বকেয়া বেতন-ভাতা অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয় সভা থেকে। সভায় বক্তারা বলেন, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র শুধু খাবার বিতরণের জায়গা নয়, এটি দেশের প্রাথমিক সামাজিক ও মানবিক উন্নয়ন কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শহরতলি, সর্বত্র অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে স্কুলমুখী করে তোলার কাজ করেন।
ছোট ছোট শিশুদের হাতে খাতা-কলম তুলে দেওয়া, বর্ণপরিচয় শেখানো, ছড়া-কবিতা, সামাজিক আচরণ ও প্রাথমিক মানসিক বিকাশের দায়িত্বও তাঁদের কাঁধেই থাকে। এর পাশাপাশি শিশুদের অপুষ্টি রোধে নিয়মিত ওজন মাপা, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, পুষ্টিকর খাদ্য বিতরণ, গর্ভবতী ও সদ্যোজাত শিশুর মায়েদের পরামর্শ প্রদান, টিকাকরণ কর্মসূচিতে সহযোগিতা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা, এসব ক্ষেত্রেও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের নেতৃত্বদের বক্তব্য, যে কর্মীরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ ও শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কাজ করছেন, তাঁরাই আজ নিজেদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সরকার তাঁদের শ্রমের মূল্য দিচ্ছে না।
এদিনের বৈঠকে উপস্থিত আইনজীবী পুরুষোত্তম রায় বর্মন সরাসরি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশ পর্যন্ত মানছে না। তিনি জানান, আদালতের রায় অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের গ্র্যাচুইটি ও পিএফ প্রদানের কথা থাকলেও বাস্তবে বহু কর্মী এখনও সেই সুবিধা পাননি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, আগামী ১৫ জুনের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মী-সহায়িকাদের সমস্ত বকেয়া গ্র্যাচুইটি পরিশোধ না করা হলে ১৬ জুন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকার শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।
ফলে কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সংগঠনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের নিয়মিত সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা প্রদান। তাদের দাবি, বছরের পর বছর পূর্ণ সময় কাজ করেও তাঁরা এখনও সামান্য সম্মানীর ভিত্তিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমান রাজ্য সরকার ক্ষমতায় আসার আগে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের নিয়মিতকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আট বছর কেটে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টে বর্তমানে নিয়মিত বেতন-ভাতা পর্যন্ত নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। সম কাজে সম বেতন নীতির ভিত্তিতে উপযুক্ত বেতন কাঠামো চালুর দাবিও জোরালোভাবে তোলা হয়।সংগঠনের মতে, সরকারি স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ ব্যবস্থার এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হচ্ছে না।
দেশের বিভিন্ন রাজ্যের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জলেন, বহু রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা তুলনামূলক বেশি সম্মানী, অবসরকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পেনশন ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ ত্রিপুরার কর্মীরা এখনও নানা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সংগঠনের দাবি, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব পালন করলেও তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এদিনের সভা থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, এবার আর শুধু স্মারকলিপি বা আলোচনা নয়, প্রয়োজনে রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনে নামবেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা।
একদিকে আদালতে আইনি লড়াই চলবে, অন্যদিকে রাস্তায় নেমে গণআন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের কর্মসূচি নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, মিছিল, গণঅবস্থান ও দপ্তর ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও গ্রহণ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন নেতৃত্বরা।
সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, এই আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, এটি রাজ্যের ২০ হাজার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকার অধিকার, সম্মান ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আন্দোলন। তাই রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এদিনের আলোচনা সভায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা অংশগ্রহণ করেন। সভায় আগামী দিনের সাংগঠনিক কর্মসূচি, আন্দোলনের কৌশল এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।