Home » Blog » ত্রিপুরা বিজেপিতে নতুন সমীকরণ

ত্রিপুরা বিজেপিতে নতুন সমীকরণ

অভিষেক দেবরায়কে ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে

by Planet Tripura
0 comments 2 views

ত্রিপুরা বিজেপিতে নতুন সমীকরণ, অভিষেক দেবরায়কে ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৮ মে :
ত্রিপুরা বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি হিসেবে মাতাবাড়ি কেন্দ্রের বিধায়ক অভিষেক দেবরায়ের আকস্মিক নিয়োগকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। দলীয় অন্দরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে দিল্লির রাজনৈতিক কৌশল— সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। একইসঙ্গে রাজ্যের মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদলের জল্পনাও ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির এই সাংগঠনিক পরিবর্তন শুধুমাত্র রুটিন রদবদল নয়, বরং আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইকে সামনে রেখেই দিল্লির নেতৃত্ব নতুন কৌশল সাজাতে শুরু করেছে। বিশেষত পাহাড়ি রাজনীতিতে তিপরা মথার ক্রমবর্ধমান প্রভাব, জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং দলের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা মতপার্থক্য এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

দলীয় সূত্রে খবর, গত কয়েকদিনে মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহা, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং বিজেপির শীর্ষ নেতাদের ধারাবাহিক দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের সঙ্গে রাজ্যের নেতৃত্ব বৈঠক করেন বলে জানা গেছে। সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্প, সাংগঠনিক বিষয় এবং আগামী রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় মহলের দাবি।

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরের নেপথ্যে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংগঠনের ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদের জন্য একাধিক নাম আলোচনায় ছিল। সম্ভাব্য দাবিদারদের তালিকায় ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী ভগবান দাস, সুবল ভৌমিক, দলের সাধারণ সম্পাদক অমিত রক্ষিত, মন্ত্রী টিংকু রায় এবং প্রাক্তন সাংসদ প্রতিমা ভৌমিক। তবে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন আরএসএস ঘনিষ্ঠ ডেপুটি স্পিকার রামপ্রসাদ পাল। শেষ মুহূর্তে রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের আপত্তির জেরেই তাঁর নাম পিছিয়ে যায় বলে সূত্রের দাবি।

এরপর আপসসূত্র হিসেবেই অভিষেক দেবরায়ের নাম সামনে আসে এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর নামেই সিলমোহর দেয়।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অভিষেক দেবরায় তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং সংঘাত এড়িয়ে চলা নেতা হিসেবে পরিচিত। ফলে তাঁকে সামনে এনে দিল্লি সম্ভবত দলীয় গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে তাঁর নিয়োগ ঘিরে দলের ভেতরে সম্পূর্ণ ঐক্য নেই বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ইতিমধ্যেই অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায় সহ একাধিক প্রবীণ নেতার অস্বস্তির খবর রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে। যদিও কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না, তবে দলের একাংশের নীরবতা এখন নতুন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির বর্তমান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাহাড়ি রাজনীতি। এডিসি এলাকাগুলিতে তিপরা মথার শক্তিশালী উত্থান বিজেপির সংগঠনকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। গত নির্বাচনে জোটসঙ্গী হলেও জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বিজেপির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল্যায়ন।

এই পরিস্থিতিতে জনজাতি কল্যাণ এবং পাহাড়ি সংগঠনকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। শুধু জোটের উপর নির্ভর না করে জনজাতি সমাজের মধ্যে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যেই নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

এই প্রেক্ষাপটেই রাজ্যের মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদলের জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, তফসিলি জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সংগঠনের সঙ্গে দূরত্ব এবং দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই দলের অন্দরে ঘুরছে বলে দাবি সূত্রের।

শুধু বিকাশ দেববর্মা নন, আরও এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভূমিকাও এখন প্রশ্নের মুখে বলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। যদিও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, দিল্লির সবুজ সংকেত মিললেই আগামী এক মাসের মধ্যেই ছোটখাটো মন্ত্রিসভা রদবদল হতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ত্রিপুরা বিজেপির বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লির নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজ্যে যতই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকুক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে।

সব মিলিয়ে ত্রিপুরা বিজেপির অন্দরে এখন চাপা উত্তেজনা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। আগামী কয়েক মাসে সাংগঠনিক পরিবর্তন ও সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা রদবদল রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

You may also like

Leave a Comment