বিজেপি সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে কংগ্রেসের বিস্তৃত অভিযোগ, জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা : সাংবাদিক সম্মেলনে ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ১২ বছরের শাসনকালকে লক্ষ্য করে একাধিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বিস্তৃত অভিযোগ তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, ২০১৪ সালের আগে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কৃষক কল্যাণ ও সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি, বাস্তবে পূরণ হয়নি, বরং দেশের বৃহৎ অংশের মানুষ আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রবীর চক্রবর্তী মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরে বলেন, রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি উৎপাদন, পরিবহণ ব্যয় এবং বাজারদরের উপর পড়েছে।
তিনি দাবি করেন, অতীতের তুলনায় বর্তমানে ১৪ কেজি ও ১৯ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিকে। একই সঙ্গে পেট্রোল ও ডিজেলের উপর কর আরোপ ও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নোটবন্দি ও জনধন প্রকল্প প্রসঙ্গে কংগ্রেস মুখপাত্র অভিযোগ করেন, কালো টাকা উদ্ধারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নোটবন্দির সময় জনধন অ্যাকাউন্টে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা হলেও সেই অর্থের উৎস ও পরবর্তী ব্যবহারের বিষয়ে জনসমক্ষে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, নোটবন্দির ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসা, অসংগঠিত শ্রমবাজার ও নগদনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে এবং বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারায়। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রবীর চক্রবর্তী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকার দেশের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, রাজস্ব ঘাটতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও উৎপাদন হ্রাসের বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি বেড়েছে এবং আয়–ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। শিল্প ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে কংগ্রেসের অভিযোগ, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিবর্তে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং সরকারি শূন্যপদ দীর্ঘদিন ধরে পূরণ করা হয়নি। আইটি সেক্টর, উৎপাদন শিল্প এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিতেও কর্মী সংকোচনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
পাশাপাশি যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা বাড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন। কৃষি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, সারের সংকট, ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং ঋণের চাপের ফলে কৃষক সমাজ ক্রমশ সংকটে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কংগ্রেস মুখপাত্র। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণের প্রবণতা বাড়ছে।
স্কুলে শিক্ষক সংকট, ড্রপআউট বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি পরিষেবায় শূন্যপদ পূরণ না হওয়াকে তিনি বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেন। নারী নিরাপত্তা, শ্রম আইন, ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী মত, গণআন্দোলন ও সরকারি নীতির সমালোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ত্রিপুরার প্রসঙ্গ টেনে কংগ্রেস মুখপাত্র দাবি করেন, রাজ্যেও কর্মসংস্থান, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা, রেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থ রক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বৃহত্তর জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে প্রবীর চক্রবর্তী রাজ্যবাসীকে সচেতন ও সংগঠিত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কংগ্রেস আগামী দিনে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে আন্দোলন জোরদার করবে।