মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবায় ত্রিপুরার সাফল্য, শিশুমৃত্যুর হার কমে জাতীয় গড়ের নিচে, প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে মুখ্যমন্ত্রীর ধন্যবাদ
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা : মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে ত্রিপুরা। ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল কর্তৃক প্রকাশিত স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) বুলেটিনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিশুমৃত্যুর হার (Infant Mortality Rate বা IMR) কমানোর ক্ষেত্রে দেশের গড়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে রাজ্য।প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ত্রিপুরায় শিশুমৃত্যুর হার নেমে এসেছে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে ১২-তে, যেখানে সর্বভারতীয় গড় ২৪।
এই সাফল্যকে সামনে রেখে সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ডা.) মানিক সাহা। তিনি উল্লেখ করেন, গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে রাজ্যে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, ২০২২ সালে ছিল ১৭, ২০২৩ সালে ১৫ এবং ২০২৪ সালে তা আরও কমে ১২-তে পৌঁছেছে। অপরদিকে একই সময়ে জাতীয় গড় ছিল যথাক্রমে ২৬, ২৫ এবং ২৪। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুমৃত্যুর হার কোনো অঞ্চলের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মের ভিত্তিতে এই হার নির্ধারণ করা হয়। ত্রিপুরার এই অগ্রগতির পেছনে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধি, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, নবজাতক পরিচর্যা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, শতভাগ টিকাকরণে জোর, গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন ইত্যাদি।
রাজ্যে বর্তমানে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রকল্প কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জননী সুরক্ষা যোজনা (JSY), জননী শিশুসুরক্ষা কর্মসূচি (JSSK), প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ মাতৃত্ব অভিযান (PMSMA), পোশন অভিযান, মিশন ইন্দ্রধনুষ, এবং আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েদের বিনামূল্যে পরীক্ষা, প্রসব, ওষুধ, নবজাতকের চিকিৎসা এবং পুষ্টি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
ত্রিপুরার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র (PHC) এবং সামাজিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র (CHC) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো গ্রামীণ এলাকার মানুষের জন্য প্রথম পর্যায়ের চিকিৎসা ও মাতৃসেবা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে সামাজিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অপেক্ষাকৃত উন্নত চিকিৎসা, প্রসব পরিষেবা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুবিধা থাকে।
জেলা হাসপাতাল এবং রাজ্যের বড় সরকারি হাসপাতালগুলির সঙ্গে এই নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকায় রোগীদের দ্রুত রেফারাল ও চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে।এছাড়াও নবজাতকদের উন্নত চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে SNCU (Special Newborn Care Unit) এবং NBSU (Newborn Stabilization Unit)। SNCU হলো বিশেষ নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট, যেখানে গুরুতর অসুস্থ, সময়ের আগে জন্ম নেওয়া বা জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা করা হয়।
NBSU মূলত জেলা বা উপ-জেলা পর্যায়ে নবজাতককে স্থিতিশীল করার ইউনিট, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রয়োজনে উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠানো হয়। স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধি ও শিশুমৃত্যু কমানোর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ত্রিপুরায় অতীতে এই হার ৯০ শতাংশেরও বেশি পৌঁছেছিল, যা মাতৃ ও নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে। দেশের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে থাকলেও ত্রিপুরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম ভালো পারফরমার হিসেবে উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ বৃদ্ধি এবং মা ও শিশুর পুষ্টি কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবায় ত্রিপুরার এই অগ্রগতি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়, এটি স্বাস্থ্য অবকাঠামো, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতার সম্মিলিত ফল বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।