রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিপন্ন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পুলিশও নিরাপত্তাহীন : প্রদেশ কংগ্রেস
নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা ২২ এপ্রিল : ত্রিপুরা রাজ্যে আইনের শাসন বলে আর কিছু নেই, প্রশাসন এখন পুরোপুরি শাসক দলের রাজনৈতিক হাতিয়ার। ভয়, সন্ত্রাস, দমননীতি আর মিথ্যা মামলার জালে সাধারণ মানুষ থেকে বিরোধী কর্মী, কেউই নিরাপদ নন। এমনই বিস্ফোরক ও আক্রমণাত্মক অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিল প্রদেশ কংগ্রেস। আগরতলার প্রদেশ কংগ্রেস ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী সরাসরি বলেন, ত্রিপুরায় এখন গণতন্ত্র নেই, আছে একদলীয় দমনমূলক শাসন।
বিরোধী কণ্ঠস্বরকে পরিকল্পিতভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে বিরোধী নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপর হামলা, হুমকি, ভয় দেখানো এবং মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। প্রশাসন নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকলেও বাস্তবে তারা শাসক দলের নির্দেশেই কাজ করছে বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। প্রবীর চক্রবর্তীর দাবি, বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রতিবাদ দমন করতে ভয় দেখানো হচ্ছে, আইনকে ইচ্ছামতো প্রয়োগ করে বিরোধীদের কোণঠাসা করা হচ্ছে।
আর যেখানে প্রশাসনকে নিজেদের মতো করে ব্যাবহার না করা যাচ্ছে সেখানে, পুলিশ আধিকারিকদেরই ধমকানো চমকানো হচ্ছে। সম্প্রতি কলমচৌরা থানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, রাজ্যে সুশাসনের নামে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে এবং পুলিশের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
অভিযোগ করা হয়, গত ১৮ এপ্রিল রাতে বক্সনগর বিধানসভা এলাকার কলমচৌরা থানায় এক অভিযুক্ত ব্যক্তি থানার ওসির সঙ্গে দেখা করতে গেলে তা নাকচ করা হয়। এরপরেই স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ফোনে থানার ওসিকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেন বলে দাবি কংগ্রেসের। এই ঘটনার পর পাঁচ দিন কেটে গেলেও পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ বা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। তাদের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের ওপর শাসক দলের প্রভাব বিস্তারের ফল।
প্রদেশ কংগ্রেসের আরও অভিযোগ, অতীতে কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে অভিযুক্ত বিধায়ককে রক্ষার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে রাজ্যে অবৈধ নির্মাণ, নেশা কারবার ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়েও শাসক দলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে দাবি করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিপন্ন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পুলিশের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তিনি রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এছাড়া, এডিসি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ এবং জাতিগত বিভাজন তৈরির অভিযোগও তোলে কংগ্রেস। কংগ্রেস মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তীর দাবি, রাজনৈতিক স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এই সমস্ত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং রাজ্যে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান হওয়ার কথা, সেখানে এখন আইনকেই বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধীদের বিরুদ্ধে।কংগ্রেসের অভিযোগ, এই সন্ত্রাস শুধু শহরকেন্দ্রিক নয় গ্রামাঞ্চলেও একই ছবি। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে শহরের ওয়ার্ড সর্বত্রই শাসক দলের প্রভাব খাটিয়ে বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ পর্যন্ত মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।
তার মতে, রাজ্যের সামাজিক সম্প্রীতিও এই পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভাজনের রাজনীতি করে মানুষের মধ্যে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। কংগ্রেস মুখপাত্র স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে, ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা মামলা দিয়ে কোনও সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস তার প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন যদি অবিলম্বে নিরপেক্ষ ভূমিকা না নেয়, তবে রাজ্য আরও গভীর সংকটে পড়বে।গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে কংগ্রেস। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মানুষের অধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে তারা আগামী দিনে বৃহত্তর গণআন্দোলনে নামবে। এটা শুধু কংগ্রেসের লড়াই নয় এটা ত্রিপুরার মানুষের গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই, এই বার্তাই স্পষ্ট করে দেয় প্রদেশ কংগ্রেস।
